আডিডাস (Adidas) হেড অফিসে একদিন

mokarram76201011211290350871_image1.jpg

ছবি-১ঃ আডিডাস ফেক্টরী আউটলেট
সেদিন সকালে ডুবে ছিলাম কাজ নিয়ে। হঠাৎ রুমে প্রফেসরের আগমন। কাছে এসে বললেন, “আগামী শুক্রবার তোমাদের গ্রুপকে আমার সাথে যেতে হবে আডিডাসের হেড অফিসের আরএন্ডডি (R&D, রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্ট) বিভাগে। তাদের সাথে আমাদের রিসার্চের কোন ফিল্ডে কোলাবোরেটিভ কাজ করা যায়, তার সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখতে হবে। সাথে তোমরা যে যেই বিষয়ে এক্সপার্ট, সেই বিষয়ের কিছু স্লাইড তৈরী করে নিবে”। প্রফেসরের অধিনে চল্লিশের অধিক গবেষকের মধ্যে আমাদের টিমে আমি ও দুই জার্মান সহকর্মী পল ও ইয়ান।

mokarram76201011211290350871_image2.jpg

ছবি-২ঃ আউটলেটের সামনে বিশাল আকারের ফুটবল
খেলাধুলার সামগ্রী, খেলোয়াড়দের ব্যবহার্য সামগ্রী তৈরীতে বিশ্বখ্যাত কোম্পানী আডিডাসের নাম কে না শুনেছে। কিন্তু সেটা যে জার্মান-বেইসড কোম্পানী আর তার হেড অফিস আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মাত্র দশ কিলোমিটারের মধ্যেই তা আগে কখনও জানতাম না (প্রথম আলোর এক কলামিষ্টের কলামে পড়েছিলাম, আডিডাস ফ্রান্সের কোম্পানী!)। নিজের অজ্ঞতার জন্যে কিছুটা লজ্জিত হলাম। যাহোক উইকিতে আডিডাস নিয়ে কিছুক্ষণ পড়াশুনা করলাম। সাথে সহকর্মী পলও কিছু জ্ঞান দিল।

mokarram76201011211290350871_image4.jpg

ছবি-৩ঃ আউটলেটের মেইন গেইট, যেখানে বিশাল আকারের টিভি স্ক্রিনে খেলা দেখার ব্যবস্থা
কথা মতো ১৯ নভেম্বর ২০১০ সকালে তিন সহকর্মী ও আমাদের গ্রুপ লিডার প্রফেসরসহ রওনা হলাম এর্লাংগেন-নুরেম্বার্গ ইউনিভার্সিটি থেকে আডিডাসের হেড অফিস হারজোগেন আউরাখ (Herzogenaurach)এর উদ্দ্যেশে। মাত্র বিশ মিনিটের পথ। গেইটে ঢুকার পর সিকুউরিটি পাস নিতে হলো। গেইটের উপরে বিশাল বিলবোর্ডে লেখা, Impossible is Nothing (কোন কিছুই অসম্ভব নয়)। রিসিপশান থেকে টেলিফোন করাতে চলে আসলেন, আমাদের হোষ্ট আরএন্ডডির টিম লিডার বৃটিশ বংশদ্ভূত ড. টিম লুকাস। সিকিউরিটি পাস হাতে পেয়ে দেখলাম তাতে লেখা, হেড অফিসের ভিতরে কোন ধরনের ছবি তোলা যাবে না। মনটা দমে গেল। ভেবেছিলাম, ব্লগ আর নিজের সংরক্ষণের জন্য কিছু ছবি তুলবো। অবশ্য এটা অপ্রত্যাশিত ছিলো না। এর আগে সিমেন্স (Siemens), বিএএসএফ (BASF), বোস (Bosch), ভক্সওয়াগন (Vox Wagen) সহ যত নামকরা কোম্পানীতে বা তাদের ফ্যাক্টরিতে গিয়েছি, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া কোন ছবি তুলতে পারিনি। টিম লিডার আমাদের সরাসরি নিয়ে গেলেন কনফারেন্স রুমে। হালকা বাক্য বিনিময়ের পর শুরু হলো আডিডাস আরএন্ডডি (R&D) টিম কি কি কাজ করে তার বিস্তারিত বয়ান। উল্লেখ, আডিডাস আরএন্ডডির নাম এআইটি (ait, adidas innovation team)। এরা মূলত নতুন নতুন ডিজাইনের স্পোর্টস সু, আপারেল উদ্ভাবন করে। সাথে সেগুলো কি কি উপাদান দিয়ে তৈরী করতে হবে তারও ডিজাইন তৈরী করে দেয়। এসব উদ্ভাবিত ও প্রস্তাবিত নতুন স্পোর্টস সু, আপারেল কত দিন পর্যন্ত টেকসই হতে পারে তার জন্য বিভিন্ন টেষ্টও করে থাকে। সাথে কম্পিউটার সিমুলেশানও করা হয়। এই কম্পিউটার সিমুলেশনে কন্ট্রিবিউট করাই মুলত আমাদের রিসার্চ গ্রুপের কাজ। আগামী ৩-৫ বছর পরে কি ধরনের নতুন ডিজ়াইনের প্রোডাক্ট বাজারে আসতে পারে তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সিমুলেশান করা হচ্ছে আডিডাস আরএন্ডডিতে। চাকরীর নিয়ম নীতির (ethics) জন্য বিস্তারিত লেখার কোন সুযোগ নেই।

mokarram76201011211290350871_image5.jpg

ছবি-৪ঃ আউটলেটের ভিতরে সাজানো স্পোর্টস সামগ্রী
দীর্ঘ তিন ঘন্টা প্রেজেন্টেশান শেষে টিম লিডার ড. লুকাস আমাদের আরও কিছু প্ল্যান্ট ঘুরে দেখালেন। ট্যুর শেষ তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আমরা কি তাদের (ভিআইপি) ডিসকাউন্ট কার্ড নিতে চাই কি না? নিলে সেই কার্ড থেকে সর্বোচ্চ ৪৫% পর্যন্ত কমিশন পাওয়া যাবে আডিডাসের তৈরী জিনিস পত্রের। আমি কিছুটা সংকোচ করলেও জার্মান সহকর্মী পল বললো, “ডিসকাউন্ট কার্ড দিলে তো ভালোই হয়”। অফিসে ফিরে বিকেলে তিন সহকর্মী গেলাম আডিডাসের ফ্যাক্টরি মেইন আউটলেটে (ছবিতে দেখুন), যেটি মূলত তাদের পন্য প্রদর্শন করার প্রধান কেন্দ্র। ঘুরে ঘুরে দেখলাম খেলাধুলা আর খেলোয়াড়দের ব্যবহার্য নানা সামগ্রী। দাম আকাশ চুম্বী। অনেক ঘুরে সব চেয়ে কম দামের যে জুতোটা পেলাম, দাম মাত্র (!) ৭০ ইউরো (বাংলাদেশী টাকায় প্রায় সাত হাজার টাকা)। সহকর্মীর সাথে গিয়েছি, কিছু একটা না কিনলে কেমন হয় (সাথে গিন্নীও টেলিফোনে চাপ দিচ্ছে চড়া দাম হলেও কিছু একটা কেন, মান সম্মান বলে কথা আছে না!), তা ভেবেই মূলত চড়া দামে এক জোড়া জুতো কেনা, নাম আডিডাস স্পেশাল। 19.gif

mokarram76201011211290350871_image6.jpg

ছবি-৫ঃ আউটলেটের ভিতরে সাজানো স্পোর্টস সামগ্রী
আডিডাস শুরুর কথাঃ জার্মানীর বেভারিয়া রাজ্যের হারজোগেন আউরাখ মূলত ছোট শহর। নুরেমবার্গ শহর থেকে ১২ কিলোমিটার। সেখানে ক্রিসটোপ ডাসলার মানে এক জুতার কামার বাস করতেন। তার দুই ছেলে। রুডলফ ডাসলার আর এ্যাডলফ ডাসলার। ক্রিসটোপের স্ত্রী পাউলিনা লন্ড্রির কাজ করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে ফেরত এসে ছোট ছেলে এ্যাডলফ ডাসলার মায়ের কাপড় ধোয়ার কারখানাতেই খেলা-ধুলোর জুতো তৈরী করা শুরু করেন। পরে তার সাথে যোগ দেয় বড় ভাই রুডলফ ডাসলার। শুরু হয় Gebrüder Dassler Schuhfabrik (Dassler Brothers Shoe Factory), মানে দুই ভাইয়ের জুতার কারখানা ও দোকান। ১৯৩৬ সালে এ্যাডলফ ডাসলার তার ফেক্টরিতে তৈরী জিনিসের ফেরী করতে যান বার্লিনের গ্রীস্মকালীন অলিম্পিকে। সেখানে আমেরিকান স্প্রিন্টার জেসি ওয়েন্সকে (Jesse Owens) রাজি করান ডাসলারের তৈরী খেলাধুলার সামগ্রী বিশেষ করে জুতা ব্যবহার করাতে। সেই অলিম্পিকে জেসি ওয়েন্স আডি ডাসলারের জুতো পরে চার চারটি গোল্ড মেডেল পেয়ে যান। সেখান থেকেই মূলত আডি ডাসলারের তৈরী সামগ্রীর সুনাম অলিম্পিকে আসা সব বিখ্যাত খেলোয়াড়দের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। এর আগেও তারা বিভিন্ন খেলাধুলার ইভেন্টে পন্যের ফেরী করেছিলেন। কিন্তু ১৯৩৬ সালেরটি ছিলো যুগান্তকারি। এর পর তাদের আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এক হিসেবে দেখা যায়, আডিডাস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে (যখন বিশ্বব্যাপী খেলাধুলার তেমন প্রসার ছিলো না) বছরে বিক্রি করতো প্রায় দুই লক্ষ জোড়া খেলা-ধুলোর নামিদামি জুতো।

আডিডাস নামটা এলো যেভাবেঃ অনেকে মনে করেন adidas নামটি এসেছে all day I dream about sport এর সংক্ষিপ্তসার থেকে। আসলে পুরোপুরি তা নয়। এটি এসেছে মূলত adi (adolf এর ডাক নাম) ও dassler (ফ্যামিলি নাম) থেকে। ১৯২৪ সালে শুরু হয়ে Gebrüder Dassler Schuhfabri নামে দুই ভাইয়ের ব্যবসা চললেও ১৯৪৯ নামে যাত্রা শুরু হয় adidas নামে। অন্যদিকে বড় ভাই রুডলফ ডাসলার আলাদা হয়ে একই জায়গায় গড়ে তোলেন রুডা (Ruda) নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান।

আজকের আডিডাসঃ এটি এখন স্পোর্টস সু, স্পোর্টস সংশ্লিষ্ট জিনিসপত্র, আপারেল তৈরীতে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম কোম্পানী। আমেরিকার নাইক (Nike) এর পরেই আডিডাসের স্থান। এর বর্তমান বাৎসরিক আয় প্রায় ১৬ বিলিয়ন ইউরো, যা ২০০৪ সাল পর্যন্ত ছিলো ১০ বিলিয়ন ইউরো। বিশ্বের অনেক দেশেই আছে আডিডাসের ফেক্টরী। এর মধ্যে ৬০% ভাগেরও বেশী প্রোডাকশান হয় চায়নাতে। বাকি গুলো আছে জার্মানী, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, অষ্ট্রিয়াসহ অনেক দেশে। আডিডাসের বিশ্বব্যাপি মার্কেট, কর্মচারি প্রায় ৫০,০০০ জন। ২০০৫ সালে আডিডাস ৩.৪ বিলিয়ন ইউরো দিয়ে কিনে নেয় সমধর্মী বৃটিশ কোম্পানী রিবোক (Reebok)কে।

আডিডাস বনাম পুমা (Puma): আগেই বলেছি, ১৯৪৮ সালে রুডলফ ডাসলার ছোট ভাইয়ের সাথে বনিবনা না হওয়ায় আডিডাস থেকে বের হয়ে আলাদা কোম্পানী গঠন করেন। নাম দেন রুডা (Ruda), Rudolf থেকে Ru, আর Dassler থেকে Da। পরে নাম পরিবর্তন করে রাখেন পুমা (Puma)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সেনারা রুডলফ ডাসলারকে ধরে নিয়ে যায়। রুডলফের ধারনা তাকে মার্কিন বাহিনীর ধরে নেয়ার পিছনে হাত ছিলো ছোট ভাই এ্যাডলফের। সেই থেকেই শুরু হয় দুই ভাইয়ের মনমালিন্য। পুমাও মূলত একই শহরে অবস্থিত, মাত্র এক কিলোমিটারের মধ্যেই আউরাখ নদীর ওপারে। লোক মুখে প্রচলিত, রুডলফ আর এ্যাডলফ দুই ভাইয়ের মধ্যে সম্পর্কের এমন অবনতি হয়েছিলো যে, মরার পর দুজনের কবরও পাশাপাশি করা হয়নি। প্রভাবশালী দুই ভাইয়ের দ্বন্দ্বের কারণে ছোট শহর হারজোগেন আউরাখ ও তার অধিবাসীরাও কার্যত দুইভাগে ভাগ হয়ে যায়। ঠিক যেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পূর্ব আর পশ্চিম বার্লিন।

আডিডাসের হেড অফিস থেকে ফেরার সময় ভাবছিলাম, দুই ভাইয়ের সামান্য জুতোর কারখানা থেকে গড়া আডিডাস ও পুমা আজ বিশ্বখ্যাত বিলিয়ন, ট্রিলিয়ন ডলার আয়ের দুটি কোম্পানী, কোয়ালিটি সম্পন্ন সামগ্রী তৈরীতে যাদের সুনাম দুনিয়া জোড়া। এতদুর আসতে কোন জিনিসটি বেশী কাজ করেছে? কিসের দরকার ছিলো বেশী? ভিশন, মিশন, অনেক টাকা নাকি শুধু পরিশ্রম?

http://www.sonarbangladesh.com/blog/mokarram76/14286

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: