আর্কাডিয়ান পেইন্টিং – ০২

গুর্য়েসিনো সম্ভবত লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি [১৪৫২-১৫১৯] এবং তার সমকালীন নিকোলাস পোসিন [১৫ই জুন,১৫৯৪-১৯ই নভেম্বর,১৬৬৫] এর চিত্রকর্মের ও তার অন্তর্গত বার্তা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। অন্তত তার কাজ দেখে তাই মনে হয়।
নিকোলাসের কথা এখানে একটু না বললেই নয়। নিকোলাস ছিলেন তার তৎকালীন প্রথম শ্রেনীর পেইন্টার। এই ফ্রেঞ্চ পেইন্টার এর কর্ম শৈলীর নিপুনতার প্রধান হলো স্বচ্ছতা, নির্মলতা, ন্যায়শাস্ত্রে, কালানুক্রমিকতায় এবং রংয়ের বিন্যস্ততার নিপুনতায়।

poussin1627.jpg

নিকোলাস এর পেইন্টিং, The Shepherds of Arcadia, বা Les Bergers d’Arcadie ভার্সন-১ যেটি আঁকা হয়েছিল ১৬২৭ সালের কোন এক সময়ে বর্তমানে সংরক্ষিত রয়েছে Chatsworth House- এ। এই ছবির পরবর্তী ভার্সনে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়, এর ক্যারেক্টারিস্টিক এ আনা হয় বর্ণগত কিছু পরিবর্তন। এই ছবিতে দুই জন মেষপালককে দেখা যায় প্রায় অর্ধেক দেখা যায় না এমন একটা সমাধিস্থানের পাশে দাড়িয়ে আছে। সমাধিফলকের লেখা পড়ার জন্য প্রচন্ড আগ্রহ আর কৌতুহল নিয়ে দুজন তাকিয়ে আছে। তার বামেই মেষপালিকাকে [সাদা পোষাকে]। ইঙ্গিতপূর্ণ ও যৌনআবেদনময়ী পোষাকে, এই ছবির পরবর্তী সংস্করনের পরিপূরক অংশে একে নিরলংকার করা হয়।
উইকিপিডিয়ায় এই ছবির দ্বিতীয় ভার্সনটার ইমেজ পিকচার দেওয়া আছে, প্রথম ভার্সনটার ছবি আদৌ এখনো কোথাও আছে কিনা জানা যায় নি – অন্তত আমি পাইনি। অপেক্ষাকৃত স্পষ্টতর ছবি খুজে পাওয়া গেল গুগল হাতড়েই। নিচেই এর দ্বিতীয় ভার্সন কিন্তু তুলনামূলক স্পষ্টরূপ দেখানোর চেষ্টা করলাম-
35366789.jpg

এই "আর্কাডিয়ার মেষপালকেরা" ছবিটি নিয়ে জল্পনা কল্পনা শুরু হয় এটি আঁকার প্রায় শুরু থেকেই। আর্কাডিয়ান পেইন্টিং [পর্ব ০১] এ উল্লেখ করা সেই কথিত এবিল এবং কেইনের ছবির রং এর বিন্যস্ততার বিস্ময়কর সামঞ্জস্যতা লক্ষ্যনীয় এই ছবিটিতেও। এছাড়াও আরো বেশ কিছু গাণিতিক ব্যাপার রয়েছে যা অনেককে আগ্রহ করে তোলে। এখানেও একই রকম দুই মেষ পালক, একজন গাঢ় লাল রঙের এবং অন্যজন কালচে নীল/নীল রঙের জামা পড়ে আছে। মেয়েটার গায়ের জামার রং দুধ সাদা।
ঠিক নিচের ছবিতে দেখা যাচ্ছে যে, লাল রং এর জামা পড়া লোকটি তার হাতের একটা কালো দন্ড জাতীয় কিছু ধরে রেখেছে। তার হাতের দন্ডটি পাশে যে সমাধির যে অংশটুকু দৃশ্যমান, তা ৭৫ ডিগ্রী কোণে বাঁকা হয়ে আছে, অন্যদিকে অন্য মেষপালকটিও, যে কালচে নীল/নীল রং এর জামা পড়ে রয়েছে সে যে চিকন একটা কাঠের লাঠি ৬০ ডিগ্রী কোণে বাঁকিয়ে ধরে রয়েছে। তবে কাঠের লাঠিটি নিয়ে কিছুটা মতদ্বৈততা রয়েছে। কেউ কেউ মনে করে থাকেন যে কাঠের লাঠিটা আসলে মেষপালকটি ধরে নেই, সেটা ধরে দাড়িয়ে আছে সাদা জামা পড়া মেয়েটা। যেহেতু নীল জামা পড়া লোকটার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে আসলে কে ধরে আছে লাঠিটা, সেক্ষেত্রে কেবল অনুমান করা ছাড়া কারুরই তেমন কিছু করার নেই। সেজন্য সেটা নিয়ে আর ত্যানা না প্যাচাই আমরা বরং।
এখানে নিচের ছবিতে যেটুকু দেখিয়েছি সেটা হলো মেয়েটা অথবা মেষপালকের হাতের কাঠের দন্ড এবং লাল জামা পড়া লোকটার আড়ালে থাকা দৃশ্যমান সমাধির কিনারা উন্নতি কোণ যথাক্রমে ৬০ ডিগ্রী এবং ৩০ ডিগ্রী। এই দুটো কোণ নির্দেশক লাল রেখা দ্বারা ছবির উপর সোজা দাগ দিলে কাঠের লম্ব এর কোণ এবং সমাধিস্থের কোণ পরষ্পরকে লম্বভাবে অতিক্রম করে যায়।
1qfwv7.jpg

একই ভাবে লাল জামার পড়া ব্যক্তির হাতে ধরে রাখা কাল দন্ডটাকেও যদি আমরা হলুদ রেখা দিয়ে ছবিতে তুলে ধরি তাহলে সেটি প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ ডিগ্রী কোণ দেখায়। মাপজোখ ছাড়া আঁকার কারনে এটা এতো নিখুতভাবে দেখানো সম্ভব হয়নি। আর আনুমানিক একটা সম্ভাব্য মান দিয়ে এটাকে দেখিয়ে দিলাম ছবিতে, ৭২ ডিগ্রী।
02.jpg

এভাবে চিত্রের মাঝে সমাধি, হাতের দন্ড, লাল, নীল এবং সাদা রং এর বিন্যস্ততা সব কিছুই রূপক বলে মনে করা হয় এক সময়। তাই শিল্পবোদ্ধা এবং গবেষকদের নজর কাড়তে সক্ষম হয় এই ছবি। বেশ দেরী করতে হয় নি এদের মধ্যকার সম্পর্ক খুটিয়ে বের করার জন্য। এখানে মেষপালক দুইজনের ঠিক মাথার উপরে গাছের হেলানো কোণও নজর কাড়ার মতো।
03.jpg

এখানে একটু কাহিনীতে মোড় আনা প্রাসঙ্গিকতা কাতারে ফেলছি।
প্রাচীন মিশরীয় দেবতা হোরাসের পিতা ওসিরিসের সব সময়কার সঙ্গী বস্তু দ্বয়ের দুটিই আছে উপরের ছবিটাতে। তার আগে ওসিরিসের মুখ দর্শন করিয়ে নেওয়া দরকার সংক্ষেপে। ইসিসকে বলা হয় সূর্যদেবতা ওসিরিসের স্ত্রী। স্বর্গ ও পৃথিবীর মধ্যে যোগসূত্র খোজার জন্য আমরা কল্পনা কাহিনীতে তুলে নিয়ে আসি নানা কাহিনী, উপকথা। সিমীত জ্ঞানে সেসবের উত্তর খুজতে না পেরে সমর্পিত হই নানা অলৌকিক কাহিনীর। সেরকই মনে হয় আমার কাছে ওসিরিস আর ইসিসের কাহিনী। মানুষ স্বর্গের কল্পনা করে তার একটা কাঠামো দাড় করিয়ে সেখানে পৌছানোর কল্পনা করতে থাকে। তুলে নিয়ে আসে পাপ পূণ্য জাতীয় কিছু উপাদান ব্যবস্থাপনার। সেই রকম ভাবেই মিশরীয় দেবতা ওসিরিস আর ইসিসকে বলা হতো স্বর্গ এবং পৃথিবীর সংযোগরক্ষাকারিনী বলে। তাদের কল্যানেই পৃথিবীর মরণশীল মানুষ স্বর্গের যাবার পথ খুজে পাবে বলে বিশ্বাস করা হতো।
220px-Standing_Osiris_edit1svg.png

অনেকটা সিনেমার ত্রিভূজ প্রেমের কাহিনীর মতো। ওসিরিসের ভাই টাইফুন ভালোবেসে ফেলেছিল ইসিসকে। ইসিসের ভালোবাসায় এতটাই মজে ছিল টাইফুন যে কখনো বুঝতেই পারেনি ইসিস তাকে ভালোবাসে না। ইসিস তখন ওসিরিসের প্রেম সাগরে ডুব দিয়েছে। শত বাধা উপেক্ষা করে, টাইফুনকে কাঁচকলা দেখিয়ে একসময় ইসিস বিয়ে করে ফেললো ওসিরিসকে। [দেখুন- ওসিরিস, ইসিস এবং টাইফুন]

টাইফুন তার প্রেমিকাকে না পেয়ে চক্রান্ত শুরু করলো নিজের ভাইয়ের বিরুদ্ধে। একবার মিশর ভ্রমন শেষে ওসিরিস যখন ফিরে আসছিল তখন টাইফুন তাকে দাওয়াত করলো তার নিজ ভোজসভায়। তারপর সেখানে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ওসিরিসকে মেরে তার লাশ ফেলে দেয় নীল নদে। ইসিস খবর পায় ঠিক তার পর পরই। খবর পেয়ে পাগল প্রায় হয়ে বেড়িয়ে পড়ে ওসিরিসের লাশ খুজে বের করার জন্য।

220px-Isis.svg.png

ওসিরিসের লাশ ভাসতে ভাসতে পাড়ি জমায় বিবলসের তীরে। [উইকি- বিবলস]
সেখানে বিবলসের তীরে গুল্ম ফুলের ঝোপ ঝাড়ের মধ্যে আটকে আটকে যেতে থাকে ওসিরিসের কফিন। আটকে আটকে যাওয়ার সময় গুল্ম ও ফুল গাছের ফুলে ফুলে ভরে উঠতে থাকে ওসিরিসের কফিনের ভিতরের অংশটুকু। এবং ক্ষনকাল পরে সেটা যে একটা কফিন তা কেউ বুঝতেই পারলো না যখন সেটা শহরের প্রায় কিনারে এসে পৌছালো। বিবলসের রাজার কানে এসে পৌছল এই কফিনের কথা, তিনি দেখতে চাইলেন কফিন টাকে। প্রজা মারফত যখন সেটা তার প্রাসাদে পৌছাল তিনি ফুল শোভিত এই কফিনটাকে দেখে এতই বিমোহিত ও মুগ্ধ হলেন যে তিনি সেটাকে কালক্ষেপন না করে রাজাপ্রাসাদের রেখে দিতে বললেন। এভাবেই ওসিরিসের পরবর্তী অবস্থান হলো বিবলসের রাজপ্রাসাদের শোভাবর্ধক থাম [বলা ভাল খাম্বা] হিসেবে।
800px-ByblosStreet.jpg

এটা হলো বিবলসের বর্তমান অবস্থা। বিবলস, লেবানন
এখানে ওসিরিসের কথা এইটুকুই রাখি।
ফিরে আসি আর্কাডিয়ান পেইন্টিং এ।
এখানে ওসিরিসের ছবিটি দেখানো জরুরী যাতে করে "আর্কাডিয়ার মেষপালকেরা" পেইন্টিং এর সাথে ওসিরিসের সম্পর্ক বুঝতে পারা যায়।
crooksandflails12.jpg

আর কিছু বলার আগে কেবল পেইন্টটাতে দুই লোকের হাতে ধরে রাখা দন্ড দুইটির সাথে ওসিরিসের দুই হাত ধরে রাখা দন্ড দুইটির কোন মিল পাচ্ছেন কি?

হাতের দন্ড এর মিল ছাড়াও ওসিরিসের ছবির সাথে আরো বেশ কিছু সামাঞ্জস্যতা খুজে পাওয়া গেছে। ওগুলো সামনের পর্বের জন্য তুলে রাখা হলো।

http://www.nagorikblog.com/node/3176

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: