নাকুরুতে দুই দিন: শ্বেতগন্ডারদর্শন এবং অন্যান্য

গেলো নভেম্বরের ২৮ তারিখে সোমালিয়ার পাট চুকিয়ে দেশে ফেরার পথে গেলাম কেনিয়ায় সপ্তাহখানেক থাকার জন্যে। আগে থেকেই প্ল্যান ছিলো লেক নাকুরু ন্যাশনাল পার্কে যাবো। ক্ষয়িষ্ণু প্রজাতির শ্বেতগন্ডারকে তার নিজের রাজত্বের মধ্যে দেখার শখ ছিলো অনেকদিন থেকে। ২০০৬ সালে প্রথম শ্বেতগন্ডার দেখি কেনিয়ার নাইরোবি সাফারি ওয়াকে। পরে যখন গতবছর প্রাণীবান্ধবদের স্বপ্ন মাসাই মারায় যাই তখন গাইড শ্বেতগন্ডার সম্পর্কে আরও বিস্তারিত বলেছিলো যদিও মাসাই মারায় সাদা গন্ডার নেই, আছে কেবলমাত্র লেক নাকুরু ন্যাশনাল পার্কে। স্থলচর প্রাণীর মধ্যে আকারে এবং ওজনে হাতির পরেই এর স্থান।

সোমালিয়ায় কর্মরত এক বাংলাদেশি ছোটভাই ওই সময়ে কেনিয়ায় অবস্থান করছিলো। ও তো এক পায়ে খাড়া ছিলো। শনি আর রবিবারের জন্যে প্ল্যান করলাম। পাবলিক বাসের উপর ভরসা না করে দুই দিনের জন্যে চড়া দামে একটা গাড়ি ভাড়া করলাম নাইরোবি থেকে। চালক আমাদের পরিচিত এবং নাইরোবি শহরে আমাদের ‘নাইট সাফারি’গুলোর নিত্যসহচর।

৩০ অক্টোবর দুপুরে যাত্রা শুরু হলো। প্রায় ঘন্টা দেড়েক যাবার পর নাইভাসা নামের একটা সুন্দর জায়গায় থামলাম মধ্যাহ্নভোজের জন্যে। খোলা মাঠের মধ্যে চেয়ার-টেবিলে বসলাম।

DSC_0035

আশেপাশে অনেকগুলো ‘হাড়গিলে’, খাবারের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। এখানে আগেও কয়েকবার এসেছি। কিন্তু এবার বেশ হতাশ হলাম। নতুন মালিক অদক্ষ এবং উদাসিন। বিরক্ত হলেও কিছু বলার নেই, অর্ডার দিয়ে ফেলেছি। একটা ছাগলের ঠ্যাং, একটা মুরগি, কিছু শাক আর ভাত। মানুষ আমরা তিনজন। খেতে খেতে ড্রাইভার পিটারের কাছ খেকে হাড়গিলে সংক্রান্ত কিছু তথ্য জানলাম। হাড়গিলের প্রধান খাদ্য মাংসের হাড়, সাথে একটু মাংস থাকলো তো জোস্‌। বড় বড় হাড়গুলোকে কুৎ করে গিলে ফেলছে। ওগুলোর গলায় ঝুলতে থাকা থলেতে পাচক রস থাকে। ওই রস হাড়গুলোকে নরম করে দেয় যাতে করে ওরা হাড়গুলো খেয়ে ফেলতে পারে। ওদের যতই পেট ভরতে থাকে ততোই পাচক রসের থলেটা ছোট হতে থাকে। পিটার বললো যে পাখিগুলের গলার থলেটা বড় হয়ে ঝুলছে ওগুলোকে আগে হাড্ডি দিতে কারণ ওগুলো বেশি ক্ষুধার্ত।

বিকেলের রোদ থাকতে থাকতেই নাকুরু শহরে পৌঁছলাম। ন্যাশনাল পার্ক এলাকায় কোনও হোটেলে জায়গা পেলাম না। বাধ্য হয়ে শহরের একটা দামি হোটেলে (হোটেল দ্য ম্যারিকা) দুটো রুম নিলাম।

এরপর পিটার বললো যে ও আমাদের মেনেঙ্গাই আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ (মেনেঙ্গাই ক্রেটার) দেখাতে নিয়ে যাবে। পথে পিটার তার পরিচিত এক স্থানীয় মহিলাকে গাড়িতে তুলো নিলো্ আমাদের ঠিকভাবে পথ দেখাতে! শহরের পাকা রাস্তা ছেড়ে আমরা গ্রাম্য পথ ধরলাম। তারপর প্রায় ৪০ মিনিট লাগলো ১২ কিলোমিটার পথ যেতে। পথে ভূমিধ্বসের কারনে রাস্তা ভেঙে যাওয়াতে আমাদের ঘুরপথে যেতে হলো। অসম্ভব সুন্দর একটা জায়গা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,২৭২ মিটার উচ্চতায় দাঁড়িয়ে আমরা। সামনেই ৯০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ৪৮৫ মিটার গভীর মেনেঙ্গাই আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ।

DSC_0089

DSC_0086

DSC_0060

DSC_0068

কয়েকটা ছোট্ট ছোট্ট স্যুভেনিরের কিয়োস্ক, খদ্দেরপাতি নেই তেমন। ৮-১৪ বছর বয়সী একদল স্কুলের বাচ্চা হাঁটাপথ ধরে নিচে নামছে আর উচ্চস্বরে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। হাই আলটিচ্যুডে উঠলে এমনিতেই গলার স্বর চড়ে যায় দেখেছি। আমারও এমন হয় সবসময়ে। বাচ্চাগুলোর সাহস দেখতে অবাকই হতে হয়। ওখানে দাঁড়িয়ে রোদের খেলা দেখতে থাকলাম। ঠিক যেনো আকাশ ফুঁটো করে রোদের আলো বেরোচ্ছে।

DSC_0077

কিছুক্ষণ থেকে শহরের দিকে রওনা করলাম। শহরে পৌঁছে রাত ১১ টা পর্যন্ত একটা নাইট ক্লাবে কাটিয়ে হোটেলে ফিরলাম।

সকাল ১০ টার দিয়ে লেক নাকুরু ন্যাশনাল পার্কে গেলাম। বিদেশিদের জন্যে এন্ট্রি ফিস বেশ চড়া, ৬০ ডলার প্রতিজন। আর যেহেতু নিজেদের গাড়ি নিয়ে যাবো, তার জন্যে আর পিটারের জন্যে আলাদা ফিস। গেটের সামনে চা খেতে গিয়ে দেখি শতে শতে বেবুন ঘুরছে। কাছে এসে দল বেধে দাঁড়িয়ে আছে যদি কিছু খাবার পায় এই আশায়। ওরা সুযোগ পেলেই রেষ্টুরেন্টের কাপ-পিরিচ নিয়ে যায়। তারপর খাবার দিয়ে ওগুলো ছাড়িয়ে আনতে হয়। বিশাল আকারের বেবুন থেকে শুরু করে গুড়গুড়ি সাইজের বাচ্চাগুলোও আছে দলের মধ্যে।

ভিতরে ঢুকতেই দেখা মিললো একদল ইমপালার, এক প্রজাতির হরিন। তারপর একঝাঁক গিনি ফাউল বা আমরা যাকে বলি তিতির পাখি বা কেউ কেউ বলে থাকেন তিতমুরগি। বেবুনরা তো আছেই। মা বেবুনের পিঠে চড়ে একটা ছোট্ট বেবুন শিশু চলছে।

উৎসুক দুই চোখে খুঁজে চলেছি সাদা গন্ডার। হঠাৎই অনেক দুরে এক জোড়ার দেখা মিললো। ক্যামেরার জুম লেন্সেও ঠিকমতো ধরতে পারলাম না। এভাবেই সামনে চলতে থাকলাম ঝাঁকে ঝাঁকে জেব্রা, বুফালো, ওয়াটার বাখ আর কিছু জিরাফ দেখতে দেখতে।

DSC_0206

হঠাৎ সামনে পড়লো অতিকায় একটা সাদা গন্ডার।

DSC_0192

রেঞ্জার বললো বেচারা অসুস্থ্য, পড়ে আছে কাদার মধ্যে। শুধু মাথাটা নাড়ছে মাঝে মাঝে। শুয়ে থাকলেও আকার বোঝা যাচ্ছে। গাড়ি থেকে নামলেও রেঞ্জারের বিনীত কিন্তু কঠোর নির্দেশে আবার গাড়িতে উঠলাম।

আবার কিছুটা যেতেই দেখা পেলাম একজোড়ার। ওরা মা আর শিশু। একদল মোষের মাঝে ওরা দুজন ঘুরছে। যে যার মতো।

DSC_0212

মোষ বা গন্ডার কাউকে নিয়ে কারোরই কো্নও মাথাব্যাথা নেই। কিছুটা হেটে বাচ্চাটা একটু ক্লান্ত হয়ে একটা গাছের নিচে শুয়ে একটু জিরিয়ে নিলো। তারপর আবার মায়ের সাথে সাথে। মা গন্ডারটা সবসময়েই বাচ্চাটাকে আগলে রাখছে।

এবার গাড়ি ঘুরিয়ে গেলাম লেকের পাড়ে পাখিদের রাজত্বে। অনেক দুর থেকে লেকের দিকে তাকালে পানি দেখা যায় না, দেখা যায় একটা গোলাপি রঙের আস্তরণ। ওরা ফ্লেমিঙ্গো। লাখে লাখে ফ্লেমিঙ্গো পুরো লেকটাকে রাঙিয়ে রেখেছে। আর আছে বিশালদেহী পেলিক্যান। তবে ফ্লেমিঙ্গোর মতো অতো না। নয়নাভিরাম দৃশ্য।
DSC_0215

সাথে জুটেছে একটা হিপ্পো। নিজের মনে নড়ছে চড়ছে, ভুস্‌ করে ঠেলে উঠছে। যে যার মতো, ঠিক যেনো সবাই রাজা।
DSC_0215

এর মাঝেই দেখি বনের মধ্যে গাছের নিচে ছোট্ট একটা সেসনা প্লেন। পিটার বললো ওটাকে যখন উড়ানো দরকার হয় তখন গাড়ির সাথে বেঁধে এয়ারষ্ট্রিপে নিয়ে যাওয়া হয়।

DSC_0157

গাড়ি ঘুরিয়ে ফেরার পথে আবার সেই মা ও শিশু গন্ডার। আমরা দাঁড়ালাম। একটু ঘোরাঘুরি করে মা বাচ্চাটাকে দুধ খাওয়াতে লাগলো। ঠিক যেনো আমাদের গরুর বাছুর। দুধ খেতে খেতে মাঝে মাঝে একটু গুঁতো দিচ্ছে।
DSC_0263

তারপর দুধ খেয়ে ক্লান্ত বাচ্চাটা মায়ের পাশে আয়েশ করে একটু শুয়ে পড়লো।
DSC_0270

অসাধারণ দৃশ্য। ছবি নিলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম এই সুন্দর দৃশ্যটা দেখেই বিদায় নেবো। মনের মধ্যে এই সুন্দরতম দৃশ্যটা গেঁথে রাখবো।
DSC_0292

http://www.sachalayatan.com/guest_writer/36240

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: