ব্রাজিলে ফাইনম্যান-১

বইয়ের প্রচ্ছদ

রিচার্ড ফাইনম্যানের নাম কে না শুনেছে। তার মত মজার পদার্থবিজ্ঞানী খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তার সিওরলি ইউ আর জোকিং, মি. ফাইনম্যান বইটা তো রীতিমতো একটা ক্লাসিক! ঐ বইটার কিছু অংশ (মূল Part 4: From Cornell to Caltech, With a Touch of Brazil/ O Americano, Outra Vez!) “নাই কাজ তো খই ভাজ” প্রকল্পের অধীনে অনুদিত হল।]

[সতর্কীকরণ: অনুবাদ কার্যে ব্যাপকভাবে অনুবাদকের স্বাধীনতা ব্যবহার করা
হয়েছে। কাজেই মূল বইটি পড়া লোকজন একটু ধাক্কা মতন খেতে পারেন। আগেই সাবধান
কইরা দিলাম :)]

একবার এক হিচহাইকার আমাকে বলেছিল দক্ষিণ আমেরিকা জায়গাটা ভারি আকর্ষণীয়, সেখানে একবার হলেও বেড়াতে না গেলে জীবনের মোটামুটি চার আনাই মাটি। আমি মিনমিন করে বলতে চেষ্টা করলাম সেখানে যাব তো বটে, কিন্তু ওদের ভাষায় তো আমি একেবারে ক-অক্ষর-গোমাংস। ঐ ব্যাটা এ কথা শুনে বলল ভাষা শেখাটা কোন কঠিন ব্যাপার নয়। আমি ভাবলাম ভালোই তো, তাহলে একবারটি দক্ষিণ আমেরিকা ঘুরে আসতে হয়।
কর্নেলে তখন বিদেশী ভাষা শেখার ক্লাসগুলোতে যুদ্ধকালীন সময়ের একটা পদ্ধতি ব্যবহার করা হত, যেখানে একটা ছোট্ট দলে জনা দশেক ছাত্র-ছাত্রী আর ঐ ভাষা জানা একজন মিলে সারাক্ষণ সে ভাষাতেই কথা বলত। যেহেতু ঐ সময়টাতে আমি ছিলাম নিতান্তই ছাত্র-ছাত্র চেহারার প্রফেসর, তাই আমি ঠিক করলাম সাধারণ ছাত্রদের মত করেই আমি ভাষা শেখার ক্লাস করব। আর যেহেতু আমি তখনও জানতাম না দক্ষিণ আমেরিকার কোন দেশে গিয়ে উপস্থিত হব, তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম স্প্যানিশ শেখাটাই ভালো হবে, কারণ দক্ষিণ আমেরিকার বেশিরভাগ দেশেই লোকজন স্প্যানিশে কথা বলে।
তো যখন ক্লাসের জন্যে নিবন্ধনের সময় এল, আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি, যে কোন মুহূর্তে ভেতরে যাবার ডাক আসবে, তখন হঠাৎ এক শ্বাসরুদ্ধকর স্বর্ণকেশীর আবির্ভাব ঘটল। জানেনই তো, কাউকে দেখে মাঝে মাঝে বুকের মাঝে কেমন সুখের মত ব্যাথা লাগে। মনে মনে বললাম, ‘ওয়াও। এই সুযোগ হেলায় হারানো যাবে না রে মমিন।‘ আশায় ছিলাম, এই মেয়ে হয়তো স্প্যানিশ ক্লাসেই ভর্তি হতে এসেছে। কিন্তু বিধি বাম, স্বর্ণকেশী সোজা গিয়ে পর্তুগীজ ক্লাসে ঢুকে পড়ল। ভাবলাম নিকুচি করি স্প্যানিশের, আমাকে পর্তুগীজই শিখতে হবে।
তারপর সোজা মেয়েটার পিছু পিছু হাঁটা ধরলাম। কিন্তু হঠাৎ কী যে হল, আমার মনের অ্যাংলো-স্যাক্সন ভূতটা বলে উঠল “একটা মেয়ের জন্যে স্প্যানিশ শেখা বাদ দিবি নাকি রে। ওসব পাগলামি করতে যাস না যেন।“ এইসব সাত-পাঁচ ভেবে শেষমেশ স্প্যানিশ ক্লাসেই নাম লেখালাম, অবশ্যি এর জন্যে পরে আমাকে প্রচুর আপসোস করতে হয়েছিল।

এর কিছুদিন পর আমি নিউ ইয়র্ক পদার্থবিজ্ঞান সংঘের এক সভায় বসে আছি, আমার পাশেই ছিলেন ব্রাজিলের জাইমে টিওম্নো, তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “এই গরমের ছুটিতে কী করছেন?”
“ভাবছি একবার দক্ষিণ আমেরিকা ঘুরে আসব।“
“ওহ। তাহলে চলে আসুন না ব্রাজিলে। আপনার জন্যে আমি ভৌতবিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রে একটা পদের ব্যবস্থা করে দিতে পারব।“
কাজে কাজেই আমার এই কয় দিনের স্প্যানিশ বিদ্যা পর্তুগীজে রূপান্তর করা শুরু করতে হল! কর্নেলে এক পর্তুগীজ গ্র্যাজুয়েটের কাছে সপ্তাহে দুদিন পর্তুগীজ শিখতে শুরু করলাম, তাই কিছুটা হলেও পর্তুগীজ ভাষা সম্বল করে ব্রাজিলের প্লেনে চেপে বসলাম। প্লেনে উঠে আবিষ্কার করলাম আমার পাশে বসেছে এক কলম্বিয়ান ভদ্রলোক, যিনি কেবল স্প্যানিশে কথা বলেন: তাই আমি তার সাথে কথা বলব না বলে ঠিক করলাম, কারণ তাতে আমার দুই ভাষার ভাসাভাসা বিদ্যায় জগাখিচুড়ি পাকিয়ে ফেলার সম্ভাবনাই বেশি ছিল। তবে আমার সামনে বসা দুজন পর্তুগীজে কথা বলছিল। আমি এর আগে সত্যিকার অর্থে পর্তুগীজে কথপোকথন শুনিনি; আমার পর্তুগীজ মাস্টার আমার সাথে খুব ধীরে ধীরে আর স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলত। কিন্তু ঐ দুই ভদ্রলোকের কথা আমার কাছে কিচিরমিচির ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছিল না, এমনকি সর্বনাম বা অব্যয়সূচক কোন শব্দও আমি আলাদা করতে পারছিলাম না।
অবশেষে প্লেন যখন রিফুয়েলিং এর জন্যে ত্রিনিদাদে যাত্রাবিরতি করল, তখন আমি ঐ দুই ভদ্রলোকের সামনে গিয়ে অতি ধীর উচ্চারণে ভাঙা ভাঙা পর্তুগীজে বললাম, “মাফ করবেন….আমার কথা কি আপনারা বুঝতে পারছেন?”
“Pues nгo, porque nгo? অবশ্যই, কেন বুঝবো না?” তারা উত্তর করল।
তখন আমি তাদের বুঝিয়ে বললাম যে এ ক’ মাস আমি পর্তুগীজ শিখছি, কিন্তু এখনো এতে সত্যিকারের কথপোকথন শুনিনি, তাই আমি এতক্ষণ তাদের কথাবার্তা শুনছিলাম, কিন্তু তার কিছুই আমার বোধগম্য হচ্ছে না।
এ কথা শুনে তারা একগাল হেসে বলল, “Nao e Portugues! E Ladдo! Judeo!” আসলে ওদের ভাষাটা ঠিক পর্তুগীজ ছিল না। তারা যে ভাষায় কথা বলছিল তার সাথে পর্তুগীজের ততোটাই মিল ছিল যতটা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার সাথে মিল আছে প্রমিত বাংলার। বুঝুন অবস্থা, কোন লোক বাংলা শেখার চেষ্টা করছে, সে যদি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে থাকা দুজন লোকের পেছনে বসে তাদের কথপোকথন শোনে, তবে সে নির্ঘাত ভাববে, “শুনে তো বাংলাই মনে হচ্ছে, কিন্তু কিছু বুঝতে পারছি না কেন। নিশ্চয়ই আমার বাংলা শেখায় সমস্যা আছে।“
পরে প্লেনে উঠে তারা আমাকে আরেক পর্তুগীজভাষী ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন, আমি গিয়ে তার পাশে বসলাম। তিনি মেরিল্যান্ডে নিউরোসার্জারিতে পড়ালেখা করছিলেন, ফলে তার সাথে কথা বলা মোটামুটি সহজতর ছিল, যতক্ষণ পর্যন্ত কথাবার্তার বিষয় cirugia neural, o cerebreu এবং অন্যান্য “জটিল” ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে হচ্ছিল। ঐ লম্বা-চওড়া শব্দগুলো পর্তুগীজে অনুবাদ করাই আসলে অপেক্ষাকৃত সহজ ছিল, কারণ ফারাকটা ছিলে কেবল শেষাংশে, ইংরেজি “-tion” পর্তুগীজে হয় “-зao” ; “-ly” হয় “-mente,” ইত্যাদি। কিন্তু তিনি যখন জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সাধারণ একটা কথা বলছিলেন তখনই আমি বিপদে পড়ে যেতাম: “আকাশ আজ নীল” কথাটাও আমি উদ্ধার করতে পারতাম না।
আমি হেসিফিতে প্লেন থেকে নেমে পড়লাম (ব্রাজিল সরকার হেসিফি থেকে রিও পর্যন্ত বিমান খরচ বহন করছিল)। সেখানে আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন সিজার লাতেসের শ্বশুর, যিনি ছিলেন রিওর সেন্টার ফর ফিজিক্যাল রিসার্চের ডিরেক্টর, তার স্ত্রী, এবং আরেকজন লোক। পুরুষদ্বয় যখন আমার মালপত্র সংগ্রহ করছিলেন তখন ভদ্রমহিলা আমাকে পর্তুগীজে জিজ্ঞেস করলেন: “আপনি পর্তুগীজ বলতে পারেন। ওহ, কী চমৎকার! কেমন করে শিখলেন আপনি এ ভাষা?”
আমি আমার সব পর্তুগীজ জ্ঞান এক করে ধীরে ধীরে উত্তর দিলাম, “প্রথমে আমি স্প্যানিশ শিখতে শুরু করেছিলাম….. পরে দেখা গেল আমি ব্রাজিল যাচ্ছি….।
তারপর আমি বলতে চেয়েছিলাম, “তাই আমি পরে পর্তুগীজ শিখি”, কিন্তু আমি “তাই” শব্দটার পর্তুগীজ মনে করতে পারছিলাম না। তবে কপাল ভালো, আমি বড় বড় শব্দ তৈরি করতে শিখেছিলাম, তাই আমি বাক্যটা এভাবে শেষ করলাম, “CONSEQUENTEMENTE, apprendiPortugues!”
পরে ডিরেক্টর সাহেব ফিরে আসলে ভদ্রমহিলা তাদের জানালেন, “ওহ, মি. ফাইনম্যান পর্তুগীজ বলতে পারেন। তাও আবার CONSEQUENTEMENTEর মতো চমৎকার শব্দ ব্যবহার করে!”
তখন লাউডস্পীকারে একটা ঘোষণা ভেসে এল, রিওর ফ্লাইটটা বাতিল করা হয়েছে এবং আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত রিও যাবার আর কোন ফ্লাইট নেই—ওদিকে আমার রবিবারের মধ্যেই রিও পৌঁছুনোর কথা।
আমি বিচলিত হয়ে পড়লাম। “হয়তো কোন কার্গো প্লেন রিও যাবে। দরকার পড়লে আমি ওতেই যাব” আমি বললাম। উত্তর আসল, “প্রফেসর সাহেব! এত ব্যস্ত হবার আছেটা কী—আপনি তো ব্রাজিলে আছেন। হেসিফি বেশ সুন্দর জায়গা। দুটা দিন এখানে ঘুরেফিরে দেখুন না। ধীরে-সুস্থে রিও যাওয়া যাবে খন।”
সে সন্ধ্যায় আমি শহরটা একটু ঘুরে দেখতে বের হলাম। এক জায়গায় দেখলাম এক দঙ্গল লোক রাস্তায় একটা চারকোণা বড়সড় গর্ত ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে—গর্তটা খোঁড়া হয়েছিল পয়নিষ্কাশনের পাইপ বসানো বা এ ধরণেরই কোন কাজে। সে গর্তে উঁকি দিয়ে দেখলাম সেখানটায় একেবারে খাপে খাপে বসে আছে একখানা জলজ্যান্ত গাড়ি! রীতিমতো চমকপ্রদ ব্যাপার: গাড়িটা সত্যিই গর্তটায় সুন্দরভাবে এঁটে গিয়েছিল, এমনকি গাড়ির ছাদও রাস্তার সমতলে ছিল। শ্রমিকরা কাজ শেষে কোন সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি বসানোর ঝামেলাতে যায় নি, আর গাড়িচালক বেচারাও সোজা গাড়ি নিয়ে একেবারে গর্তে সেঁধিয়ে গিয়েছে। আমেরিকার সাথে ব্রাজিলের একটা পার্থক্য তখনই বুঝতে পারলাম: যখন আমাদের রাস্তায় গর্ত খোঁড়া হয়, তখন সেখানে নানান রকম সতর্কতা বাণী সম্বলিত বোর্ড, আলো ইত্যাদি বসানো হয়। আর এখানে লোকজন রাস্তা খোঁড়ে, আর কাজ শেষ হলে কোন সতর্কতার ব্যবস্থা না করেই স্রেফ বাড়ি চলে যায়।
তবে হেসিফি ছিল সত্যিই সুন্দর একটা শহর এবং আমি ঠিকই পরবর্তী মঙ্গলবার পর্যন্ত অপেক্ষা করে রিও পৌঁছুই।

http://www.sachalayatan.com/guest_writer/35728

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: