নারী -” ডান হাতে খড়গ জ্বলে, বাঁ হাত করে শংকাহরণ”

যুগ যুগ ধরে কোমলতার প্রতীক রুপে মানা হয় নারীকে। নমনীয়তার কোন কথা উঠলেই উপমা হয়ে আসে নারী। আজন্ম লালিত ধ্যান ধারনার মমতাময়ী বাহক। এই সুনির্দিষ্ট গন্ডির বাইরে কেউ কেউ যে বেরিয়ে আসতে চায় না তা নয়, তবে প্রবল ইচ্ছাশক্তি, প্রতিকূলতার সামঞ্জস্যকর সুব্যবস্থাপনাতে মুষ্টিমেয়রাই উদ্ভাসিত হতে পারে পাদ-প্রদীপের আলোয়। অনেকক্ষেত্রে এরাই সুপরিচিত হন ইস্পাত কঠিন রমনীতে। কাজের পরিব্যপ্তি, সিদ্ধান্ত নেয়ার দৃঢ়তা, পরিস্থিতির সাথে চলার ক্ষমতাই সমাজে নারীকে প্রতিস্থাপিত করে কঠিন মানবী রুপে। ঠিক যেন “ ডান হাতে খড়গ জ্বলে, বাঁ হাত করে শংকাহরণ ”।

ইতিহাসের পাতায় ঠাইঁ করে নেয়া অনেকের মাঝে তেমনই অনমণীয় নারী হিসেবে পাওয়া যায় হাতশেপসুৎ, এলিজাবেথ I, মাতাহারি আর মার্গারিট থ্যাচারের নাম।

হাতশেপসুৎ – রানী নয় ছিলেন যিনি রাজা!
images hatshepsut.jpg

দৌর্দন্ডপ্রতাপ বিশিষ্ট ক্ষমতাশালী নারী রুপে ইতিহাসে প্রথম নাম আসে মিসরের হাতশেপসুৎ’র নাম, ফারাও হিসেবে যার ক্ষমতাকাল ছিলো প্রায় ২২ বছর (১৪৭৯ -১৪৫৭ বিসি)। রাজা থুথমোস II এর মৃত্যুর পর, রানী হাতশেপসুৎ নিজেকে ফারাও রুপে ঘোষনা করেন। অতুলনীয় আর বুদ্ধিমত্তায় অনন্য এই নারী সর্বাপেক্ষা সাফল্যমন্ডিত ফারাও হিসেবে পরিগনিত হয়। তার শাসনকালে ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নতি এবং ব্যবসা-বানিজ্যের উত্তরোত্তর বৃদ্ধি সাধন ঘটে। অনন্য সুন্দর মন্দির স্থাপনা এবং পুরোনো মন্দির সংস্কারের জন্যেও তার আমল সর্বজনবিদিত। যুদ্ধবিগ্রহ দমনে সবচেয়ে সাফল্য আসে হাতশেপসুৎ’র আমলে। রাজ্যের সবচেয়ে দীর্ঘ শান্তিপূর্ন শাসনামল ধরা হয় এই আমলকে। একজন নারীর শাসন সর্বগৃহীত করার এবং কঠোরভাবে সিদ্ধান্ত পালন করানোর জন্যে হাতশেপসুৎ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। রাজাবেশে উপস্থিত হতেন তিনি সবার সামনে। শুধু যে পোষাক-পরিচ্ছদ পুরুষের মতো তা নয়, চেহারার নারী কমনীয়তা প্রকাশ না করার নিমিত্তে নকল দাড়ি ব্যবহার করতেন! শুধু নিজেকে ফারাও ঘোষনা দিয়েই ক্ষান্ত হননি, অন্ধবিশ্বাসী জনগনের মাঝে নিজেকে দেবতাতুল্য একজন করে তোলার জন্যে নানান ধরনের গল্প ছড়ানোর ব্যবস্থা করেছিলেন, যাতে বুঝানো হতো ঈশ্বর তার সাথে যোগাযোগ করেন, কথা বলেন! সঠিক সিদ্ধান্ত আর কাজের পাশপাশি ক্ষমতাশালী ফারাও রুপে প্রতিষ্ঠিত হবার তার এইসব পদ্ধতি কাজেও এসেছিলো।

এলিজাবেথ I – কুমারী রানী, গ্লোরিয়ানা!

images of elezabeth 1.jpg

রাজকুমারী হিসেবেই জন্মগ্রহন করা রাজা হেনরি VIII এর সন্তান নানান ঘাত-প্রতিঘাতের মাঝে ২৫ বছর বয়েসে ইংল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ডের শাসনভারে অধিবেশিত হন। ৪৪বছরের শাসনকালে (১৫৫৮ -১৬০৩) আমৃত্যু পর্যন্ত মহিমান্বিত ব্যক্তিত্ব রুপে। রানী হিসেবে তার নেয়া আলোচিত পদক্ষেপের মাঝে অন্যতম হচ্ছে ‘ইংলিশ প্রোটেষ্টেন্ট চার্চ’ প্রতিষ্ঠা করা। অগ্রজদের তুলনায় অনেকটা উদারপন্থী মনোভাব নিয়ে চলতেন। উইলিয়াম শেক্সপিয়ার, ক্রিস্টোফার মার্লো’দের মতোন বিখ্যাত লেখকদের অসাধারন লেখনীর বদৌলতে এলিজাবেথ I এর শাসনামল সুপ্রসিদ্ধ হয়ে আছে ‘ইংলিশ ড্রামা’র সমৃদ্ধি লাভের কাল রুপে। শত বিতর্ক, সকল অনুরোধ স্বত্তেও, এমনকি পার্লামেন্টের পিটিশন জারির পরও এলিজাবেথ I বিয়ে করেন নি। কুমারী রানী রুপেই প্রশংসনীয় হয়েছিলেন। স্ত্রীদের সাথে বাবা ‘হেনরি VIII’ এর দূর্ব্যবহার বিয়ের প্রতি বিতঃস্বদ্ধ করে তুলেছিল তাকে এবং আর সত্যিকার ভাবে যাকে ভালোবেসে ছিলেন, তাকে বিয়ে করা সম্ভবপর ছিলো না কারন যতদিনে রানী হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়েছেন ইতিমধ্যে সে ব্যক্তি বিবাহিত। বিয়ে না করার কারন হিসেবে যুগপৎভাবে এই দু’টি কারনই উল্লেখ্য করা যায়। রাজ্যে স্থিতিশীলবস্থা বজায় রাখতে এবং জাতিগত পরিচিতি প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে ‘এলিজাবেথ I যুগ’ অনেক বড়ো ভূমিকা রেখেছে।

মাতাহারি – রহস্যময়ী গুপ্তচর!

images matahari.jpg

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আমলে ফ্রান্সে সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় চিত্তাকর্ষনীয় নাচের অন্যতম আকর্ষন ছিলো মাতাহারি’র যৌনাবেদনময়ী উপস্থাপনা। ডাচ বংশদ্ভুত নৃত্যপটিয়শী মার্গারিটা গ্রিটুইডা জ্যেলে’র স্টেজ নাম হলো মাতাহারি (১৮৭৫-১৯১৭)। এমন এক বারবনিতা যে কিনা নির্দোষ হওয়া স্বত্তেও জার্মানীর হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ফ্রান্সের ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুবরণ করে। ঝঞ্ঝাময় বিবাহিত জীবনের ইতি টেনে মার্গারিটা ফ্রান্সে পাড়ি জমায় নেদারল্যান্ড থেকে নতুন নাম নিয়ে। অল্প দিনেই সাফল্য আসে। খোলামেলা নাচের মোহনীয়তায় অসংখ্য ভক্তকুল সৃষ্টির পাশাপাশি এমনসব গুনগ্রাহী গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল যারা তার সঙ্গলাভের জন্যে মূল্যবান উপহার সামগ্রীর পাহাড় তৈরী করে দিতো, এরা সমাজের উচুঁপদের বিশিষ্টজন, আর্মি অফিসার, রাজনীতিবিদ, ক্ষমতাধরব্যক্তি আর অভিজাতবংশীয় ছিলো। তৎকালীন জার্মান ক্রাউন প্রিন্সও এই দলে সামিল ছিলো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কালীন ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্সের নজরে আসে মাতাহারি স্পেন এবং ব্রিটেন হয়ে ফ্রান্স এবং নেদারল্যান্ডে তার উপর্যোপরি যাতায়াতের কারনে। এক জিজ্ঞাসাবাদে মাতাহারি স্বীকার করে যে, ফান্স মিলিটারির এজেন্ট হয়ে কাজ করছে সে। মাদ্রিদে অবস্থানরত জার্মান নেভাল এবং আর্মিদের সাথে সম্পর্ক বাড়িয়ে প্যারিস ইন্টেলিজেন্সের কাছে খোজঁখবর পৌছানোই তার কাজ। জানুয়ারী ১৯১৭, ফ্রান্স ইন্টেলিজেন্স, জার্মান মিলিটারির একটি রেডিও মেসেজের সন্ধান পায়, যার মাধ্যমে হদিস পায় জার্মান গুপ্তচর H21এর যেটা মাতাহারি’র কোডনেম। “ডাবল এজেন্ট” অভিযোগে বিচারের নামে প্রহসনের মাধ্যমে শাস্তিপ্রদান এবং মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা অতি দ্রুততার সাথে, সেই সাথে এই মামলা সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র সিল করে দেয়া হয় ১০০ বছরের জন্যে! যদিও ৩২ বছর আগেই সেই ফাইল খোলা হয় এবং প্রকাশ পায় মাতাহারি’র নির্দোষিতা। বিশ্বযুদ্ধের কালেই বিতর্কিত হয়েছিল এই দন্ডাদেশ। বলা হয়ে থাকে, ফ্রেঞ্চ কাউন্টার এসপিওনাজের অধিকর্তার কোন ভুলের বলিরপাঠাঁ হয়েছে মাতাহারি। আর যে মেসেজের সূত্র ধরে মাতাহারি’র নাম আসে ‘ডাবল এজেন্ট’ হিসেবে, তা যে কোডওয়ার্ডে পাওয়া গেছে ফ্রান্স তা পাঠোদ্ধারে সক্ষম জানা স্বত্তেও জার্মান ইন্টেলিজেন্সের সেই কোডে মেসেজ পাঠানো অযৌক্তিক তা সহজে বোধগম্য। ফায়ারিং স্কোয়াডের প্রতক্ষ্যদর্শীদের কাছ থেকে নানান চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া যায়। নিজেকে সবসময় নির্দোষ দাবিকারি মাতাহারি, হাত এবং চোখ বাধঁতে অস্বীকার করে শঙ্কাবিহীনভাবে ছিলো পুরোটা সময়, বাতাসে চুম্বন উড়িয়ে দিয়েছিলো একটা সময়। তখনও ভাবলেশহীন ভাবে তাকিয়ে ছিলো সবার দিকে যারা গুলি করছিল তাকে লক্ষ্য করে, এমনকি গুলি লাগার পরও হাত-পা ছুড়ে হুট করে পড়ে যায়নি মাতাহারি’র শরীর, দু’হাটুঁ গেড়ে বসে পড়ে গা এলিয়ে দিয়েছে আকাশের দিকে চোখ মেলে।

মার্গারিট থ্যাচার – জনপ্রিয় লৌহমানবী!

images margaret.jpg

লৌহমানবী নামে বহুল পরিচিত মার্গারিট থ্যাচার একই সাথে অধিবেশিত ছিলেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এবং কনজারভেটিভ পার্টির প্রধান হিসেবে। সুচারুভাবে কাজ করে গেছেন দীর্ঘ তিন মেয়াদে (১৯৭৯-১৯৯০)। ‘কোল্ড অর’ জিইয়ে রাখা, এ্যান্টি কমিউনিজম, বেশিরভাগ সরকারী শিল্পসংস্থার প্রাইভেটাইজেশন করা, ট্রেড ইউনিয়নের উপর কঠোর মনোভাবপোষন, স্যোশাল সার্ভিসের খরচ কমানো ইত্যাদি সিদ্ধান্তের কারনে তাকে যেমন নন্দিত করেছে পাশাপাশি নিন্দিতও। কিন্তু দূরদর্শী চিন্তার অধিকারিনী থ্যাচার নিন্দা গায়ে না মেখেই এগিয়ে গিয়েছেন। দেশ ও জাতিকে আবেগ বিবর্জিত অবস্থা থেকে সরিয়ে কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত উন্নতির দিকেই ধাবিতকরনে উৎসাহিত করেছেন। ব্রিটেনকে আধুনিকায়ন করার শ্রেয় অনেকাংশেই পাওনা থ্যাচারের।

সূত্রঃ উইকিপিডিয়া

http://www.amrabondhu.com/jabin/1946

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: