জাদু চামচ

মনে করুন আপনি একটা টিপটপ রেস্টুরেন্টে গেছেন ব্রেকফাস্টের জন্য। ঝকঝকে ভোরবেলা, টেবিলের উপর গ্লাসে রাখা টাটকা সাদা গোলাপটার উপর রোদ এসে পড়ছে। খুশি খুশি মনে পাশের টেবিলের মহিলাটির দিতে তাকালেন এক বার। ফিটফাট পোষাকে ওয়েটার এসে মেনু আর এক গ্লাস ঠান্ডা জল দিয়ে গেল টেবিলে। মেনু দেখে আপনি ভাবলেন, আজ কন্টিনেন্টাল ট্রাই করা যাক। ওয়েটারকে বললেন, অমলেট দিয়ে টোস্ট, অরেঞ্জ জুস, আর দুধ ছাড়া চা; বেশি কিছু না আজকে। জলদিই খাবারপত্র দিয়ে গেল ওয়েটার। সুন্দরভাবে ভাঁজ করা আকাশী ন্যাপকিনটা কোলে পেতে নিয়ে গরম টোস্টে এক কামড় দিলেন আপনি। উমম। বেশ করেছে জিনিসটা। এবার একটু চা খাওয়া যাক। আপনি আবার স্বাস্থ্যসচেতন। চিনি না নিয়ে পাশের সেট থেকে জিরো-ক্যালরি সুইটনারটাই নিলেন আপনি। কাপে ঢেলে চামচ দিয়ে অল্প করে মিশিয়ে নিলেন।

কিন্তু চা থেকে চামচটা তুলে আপনি হাঁ। ডাঁটিটুকু হাতে রয়ে গেছে শুধু, চামচের বাকিটা কই? চায়ে মিশে গেল নাকি?

কোনো ভদ্রসভ্য রেস্টুরেন্টে এমন হলে অবাক হবার কথা বইকি। কিন্তু ব্যাপারটা কি? রেস্টুরেন্টের লোকেরা একটু মজা করেছে আপনার সঙ্গে। রোজকার স্টিলের চামচ না দিয়ে একটা গ্যালিয়ামের চামচ গছিয়ে দিয়েছে আজকে। ওই দেখুন পাশ ফিরে, কিচেনের আড়াল থেকে সুন্দরী ওয়েট্রেস মুখে রুমাল চাপা দিয়ে খিলখিল করে হাসছে। আপনার রাগও ওই চামচের মতনই গলে জল হয়ে যাবে।

৩১ আণবিক-সংখ্যা বিশিষ্ট গ্যালিয়াম একটি ধাতু, পর্যায়-সারণীতে অ্যালুমিনিয়ামের ঠিক নিচেই, স্বভাবচরিত্রও তারই মত, দেখতেও সেরকমই। শুধু, মাত্র ৩০ ডিগ্রী তাপমাত্রাতেই গলে যায় পাজিটা। সেই জন্যেই গরম চায়ে ডোবানো মাত্র গলে গিয়ে আপনাকে ধোঁকা দিয়েছে। তবে চিন্তা নেই, চা-টা এখনও খাওয়া যাবে – তরল ধাতু ভারী বলে তলায় গিয়ে থিতিয়ে গিয়েছে, আর গ্যালিয়াম বিষাক্ত নয়।

পর্যায় সারণীর প্রতিটি মৌলের স্বভাবচরিত্র নিয়েই এমন কত গল্প বলা যায়। এমনকি সেই সব মৌল, যাদের প্রাকৃতিকভাবে এই পৃথিবীতে পাওয়া যায় না, তাদের আবিষ্কার নিয়েই তো এক একটা রোমহর্ষক কাহিনী লিখে ফেলা যায়। আর তাদের কীর্তিকলাপ? এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি থেকে আমাদের শরীর, সর্বত্রই তাদের কাজকর্ম, একচুল এদিকওদিক হলেই গেল… কি ভাগ্যি তারা সবাই পদার্থবিদ্যার নিয়ম মেনেই চলাফেরা করে, বদমাইশির সুযোগ নেই।

জানেন কি, পদার্থবিজ্ঞানী মারী কুরী’র স্বভাব ছিল পুরুষ সহকর্মীদের বাড়ি গেলে তাদের নিয়ে অন্ধকার আলমারীর মধ্যে লুকিয়ে পড়া? কেন? কি করতেন তিনি ওভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে? উঁহু, দুষ্ট পাঠক, আপনার মনই ময়লা। মানলাম, মারী দিদিমনির এক্সট্রাম্যারিটাল অ্যাফেয়ার ছিল, কিন্তু ওভাবে কেবল ডেমনস্ট্রেশনের জন্যই লুকোতেন তেনারা। অমন কি গবেষণা করতেন? জানতে হলে পড়তে হবে, ‘দা ডিস্যাপিয়ারিং স্পুন’, যার নামের উৎস থেকেই শুরুর ঘটনাটি বানানো।

বিজ্ঞান নিয়ে নন-ফিকশন পড়তে আমি বেশ পছন্দ করি। সদ্য শেষ করলাম, স্যাম কীন’এর ওই ‘দা ডিস্যাপিয়ারিং স্পুন’ বইটি। বেশ মুখরোচক লেখা। ভদ্রলোক গবেষক নন, একজন আমেরিকান লেখক ও জার্নালিস্ট। অনলাইন ম্যাগাজিনগুলোতেও লেখেন-টেখেন, লেখার হাত ভাল। এই ২০১০ সালেই বেরিয়েছে বইটা, সাড়ে তিনশ পাতার বই হলেও বড় বড় হরফ, চটপটই শেষ হয়ে যায়।

এই বইটা মূলত পর্যায়-সারণী ধরে প্রতিটি মৌলের চরিত্র-কথন। কিন্তু একেকটা মৌল ধরে খানিকটা করে বিবরণ, এমন নয়, তাহলে হয়ত বোরিং হতে পারত। কয়েকটা মৌল, যেগুলোর ব্যবহার বা গুরুত্ব কাছাকাছি রকম, সেগুলো নিয়ে একেকটা অধ্যায় বানান উনি। যেমন ‘পলিটিকাল এলিমেন্টস’ বলে একটা অধ্যায় করেছেন, যে সব মৌলের উৎস বা ব্যবহারের মধ্যে রাজনীতির গল্প মিশে রয়েছে। যেমন – আবার মাদাম কুরী।

পোল্যান্ডে মারী স্লোদোস্কা নামে জন্মেছিলেন যখন, তখন পোল্যান্ড রাষ্ট্রটার অস্তিত্বই নেই, রাশিয়া দখল করে রেখেছে। মেয়েদের পড়াশোনারও বিশেষ সুযোগ নেই। চলে যান ফ্রান্সে, সেখানে পিয়ের কুরীকে বিয়ে; দুজনে মিলে গবেষণা করতেন। কিন্তু পরাধীন দেশের প্রতি টানটা ছিলই। তেজষ্ক্রিয়তা সম্বন্ধে গবেষণা করতে করতে আবিষ্কার করেন দুটি নতুন তেজষ্ক্রিয় মৌল, আর দেশের প্রতি সম্মান দেখাতে তার একটার নাম দেন পোলোনিয়াম। আশা ছিল, এতে হয়ত সারা দুনিয়ার বিজ্ঞানীদের কিছুটা সহানুভূতি আসবে পোল্যান্ডের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি।

কিন্তু সুবিধা হল না। বিজ্ঞানীরাও মানুষ; তাঁরাও তখন মাদাম কুরীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে দুষ্টুমিষ্টি গল্পেই আকৃষ্ট। আর সেসব ছড়ানোর উপাদান যে ছিলই, সে তো দেখলেনই। আসলে সে সময় অনেক বিজ্ঞানীই তেজষ্ক্রিয়তা বিশ্বাস করতেন না, তাঁদের মতে পরমাণু অবিভাজ্য। এবং সে সময় প্রায় সব বিজ্ঞানীই পুরুষ। তাঁদের বিশ্বাস করানোর জন্যই অন্ধকার আলমারীতে ঢুকে তেজষ্ক্রিয় বিচ্ছুরণের আলো দেখাতেন তেজষ্ক্রিয় ধাতুর থেকে। আর সেসব বিজ্ঞানীদের বৌ রা… যাহোক, ওই দেশাত্মবোধক উদ্দেশ্যে মাদাম কুরী ঠকেই গেলেন, কারণ পরিচিত হবার মত কোনো রাসায়নিক গুণই পোলোনিয়াম’এর ছিল না। বরং অন্য আবিষ্কৃত ধাতুটি, রেডিয়াম, যার তেজষ্ক্রিয় জ্যোতি দেখাতেন তিনি আলমারিতে লুকিয়ে, সেটাই তার ধর্মের কারণে প্রচণ্ড জনপ্রিয় হয়ে উঠল। লোকে রেডিয়াম-গোলা জলও বিক্রি করতে শুরু করল, খেয়ে যাতে শরীরে অমন ‘তেজ’ হয়।

পোলোনিয়াম সংবাদের হেডলাইনে এসেছিল অবশ্য কিছুদিন আগেই। রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি’র প্রাক্তন গুপ্তচর লিটভিনেঙ্কো ওই সংস্থারই কিছু বেচাল ফাঁস করে দিতে পারেন এমন কথা ওঠার অল্পদিন পরেই মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং দ্রুত মারা যান। জানা যায়, ওরাই ‘আপদের শেষ রাখতে নেই’ পন্থায় লন্ডনের রেস্তোরাঁয় তাঁকে পোলোনিয়াম-দেওয়া সুশি খাইয়েছিল, যাতে শরীরে তেজষ্ক্রিয়তার প্রভাবে তিনি দুনিয়া থেকে গুডবাই হন। দেখেন, রেস্তোরাঁয় কতরকম কেচাল হতে পারে!

বইটাতে এমন বহু গল্প রয়েছে, যেগুলোর প্রতিটাই খুব ইন্টারেস্টিং। ওই দেখুন, একটা মৌলের মধ্যেই কেমন তার আবিষ্কারকের সম্বন্ধে গল্প, আবিষ্কারের ঘটনা, নামকরণের জটিলতা, তার অদ্ভুত সব প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক ধর্ম, তার ব্যবহার, আমাদের জীবনে তার কি কাজ, এসবের কত কেচ্ছাকাহিনী ঢুকে পড়েছে। তাও সহজে পাওয়া যায় না, সাধারণভাবে কোনো কাজে লাগে না, এমন একটা মৌল সম্বন্ধেই।

আর এইসব গল্পের সঙ্গেই মিশে আছে পদার্থবিদ্যা আর রসায়নের সব গল্প। যেমন নানা উন্নত পদ্ধতি আবিষ্কারের মাধ্যমে এইসব মৌল আবিষ্কারের উপায় হয়েছে, তেমনই এদের আবিষ্কারের মধ্য দিয়েই নতুন প্রযুক্তি পাবার পথ হয়েছে। আর সেসব প্রযুক্তি আজকাল আমাদের শোনাতে পারছে সেই বিগ ব্যাং এর গল্পও। আবার ভবিষ্যতে প্রযুক্তি কোনদিকে এগোবে, সুপারকণ্ডাক্টার আর কোয়ান্টাম কম্পিউটিংএর পথে কি না, তা নিয়েও গবেষণার খোরাক দিচ্ছে।

শুধু পদার্থবিদ্যা আর রসায়ন কেন? মৌলরা দিকনির্দেশ করে দিচ্ছে সব ধরনের বিজ্ঞানেরই। কার্বন ডেটিং করে বলতে পারছি ফসিলের বয়স। সীসা-ইউরেনিয়ামের অনুপাত মেপে ভূ-তত্ত্বের লোকেরা বলছে পাথরের বয়স। শরীরের মধ্যে একটুখানি বেরিয়াম ঢুকিয়ে এমআরআই করে টিউমারের হালচাল জানা হচ্ছে। অতিবেগুনি রশ্মিতে ফ্লুরোসেন্ট হয় এমন ইউরোপিয়াম-এর যৌগ দিয়ে এঁকে নোট জাল করা ঠেকানোর উপায় করা যাচ্ছে। সর্বত্রই মৌলদের কীর্তিকলাপ।

লেখকের গল্পগুলো বলার স্টাইলও বেশ মজার। বিশেষ করে তাদের আবিষ্কারক বিজ্ঞানীদের সম্পর্কে। যেভাবে বাবা-মা ছেলেমেয়ের দুষ্টুমির কান্ড বলে মজা পায়, সেভাবে তাঁদের পাওয়া এবং তার পেছনের অনেকটা না-পাওয়ার গল্প শুনিয়েছেন, পাগলা বৈজ্ঞানিকদের থেকে নোবেলজয়ীদের পর্যন্ত। ছোটবেলায় যদি থার্মোমিটার ভাঙলে ভেতরের চকচকে তরলটা নিয়ে খেলে মজা পেয়ে থাকেন, তাহলে এই বইটাও আপনার মজাই লাগবে। পড়ে দেখেন।

××××××××××××××××××

পুনশ্চ: বইটার দু জায়গায় আমার খটকা আছে। এক, এনরিকো ফার্মির সম্বন্ধে বলেছেন, যে বেরিলিয়াম পাউডার নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করতে করতে ফুসফুসে তার গুঁড়ো জমে, যেমন অনেক মিস্ত্রীর ফাইবার গ্লাসের জানলা কি চালা কাটার সময় গুঁড়ো ঢুকে হয়, নিউমোনাইটিসে আক্রান্ত হন, তাতেই নাকি তার মৃত্যু হয়। কিন্তু নেটে সব জায়গাতেই দেখলাম, ফার্মির মৃত্যু নাকি পেটের ক্যান্সারে। সচলের পাঠকেরা কেউ বলতে পারেন, আসলটা কি?

দুই, একধরনের বেরী’র ফল থেকে মিরাকিউলিন নামের একটা প্রোটিন পাওয়া যায়, যেটা খেলে টককেও মিষ্টি লাগে, লেবুর রসকে মিছরি গোলা মনে হয়। মনে করা হচ্ছে, জিভের স্বাদনির্ণায়ক কোষগুলিতেই এ কিছু কারিকুরি করে, যা অনেকক্ষণ থাকে। আর এর উলটো কাজ করে জিমনেমিক অ্যাসিড নামের এক জৈব অ্যাসিড, যেটা একরকমের গাছের পাতায় পাওয়া যায়। এটা খেলে চিনিকে বালির মত বিস্বাদ লাগে। বইয়ের বক্তব্য, এটা পটাশিয়াম জিমনেমেট, ওই অ্যাসিডের সঙ্গে পটাশিয়ামের যৌগ, খেলে হয়, এবং পটাশিয়ামই আসলে এই কাজটা করে, ওই অ্যাসিডটা নয়। কিন্তু উইকি বলছে শুধু অ্যাসিডটা খেলেও ওটা হয় – তাহলে পটাশিয়ামের দোষ থাকে না। এ ক্ষেত্রেই বা সত্যিটা কি?

ও হ্যাঁ, শুরুর ছবিটা বিসমাথ কেলাসের। মায়া সভ্যতার ডিজাইনের মত লাগছে না?

http://www.sachalayatan.com/kaustubh/35657

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: