পিপলি লাইভ


বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে জীবনের পুরো সময় জুড়েই অনেক যুদ্ধ করে যেতে হয়। যুদ্ধে জয়ী কেউ বনে যায় বিশাল সাম্রাজ্যের মালিক আবার পরাজিত কেউ পথের ভিখিরি একবেলা ভাতের জন্য প্রখর রোদে দিনের পর দিন কাজ করে যায় কেউ, আবার কারো ঘরে নষ্ট হয় অনেক মানুষের খাবার।

কৃষকের মুখে হাসি ফুটে গোলা ভরা ধানে, আবার বন্যার পানিতে ফসল ডুবে গেলে কৃষকের হাসি মুখ তখন ধানের গোলার মত বিস্তৃত, চোখে জল, বন্যা কান্নার পানি মূহুর্তেই মিলেমিশে একাকার। খরায় ফেটে চৌচির হয়ে যায় ফসলের ক্ষেত, সাথে ভেঙ্গে যায় কৃষকের মন। সব হারিয়ে তখন কেউ ছুটে যায় সুদখোর মহাজনের কাছে, কেউ যায় চড়া সুদে ঋণ নিতে ব্যাংকে আবার কেউ হতাশা নিয়ে পালিয়ে বাঁচতে চায় জীবন ছেড়ে।

পরিচালক আনুশা রিজভী তার নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র পিপলি লাইভ‘র দৃশ্যে দৃশ্যে দেখাতে চেয়েছেন কৃষকদের জীবনের গল্প। ব্যাংকের লোনের টাকা দিতে না পেরে সাধারণ এক কৃষকের আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং মিডিয়ার বদৌলতে নাত্রা নামের সাধারণ এক কৃষকের রাতারাতি কৃষক থেকে দেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী হয়ে যাওয়া- এসব নিয়েই চলচ্চিত্র পিপলি লাইভ। নির্মাণে গতানুগতিক ধারার বাইরে নতুন কোনো চমক নেই, একেবারে সাদামাটা। কিন্তু কাহিনীতে অসাধারণ, একেবারে হৃদয়ছোঁয়া গল্প।

পিপলি লাইভ ছবিটি নিয়ে শুরু থেকেই আলোচনা ছিল। বলিউডের বিগ বাজেট আর তারকাবহুল ছবির সাথে পাল্লা দিতে এই ছবিটি কতটুকু কি করবে এই প্রশ্ন তুলেছিলেন অনেকেই। এছাড়া সাংবাদিকতা পেশা ছেড়ে চলচ্চিত্র পরিচালক বনে যাওয়া আনুশা রিজভী তার প্রথম ছবিতে আহামরি এমন কিছু একটা করে দেখাবেন এই আশা করেননি অনেকেই। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এই আনুশা রিজভীর মুখে ছবির গল্প মাত্র একবার শুনেই ছবিটি প্রযোজনা করতে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন সুপারস্টার আমির খান ! ছবির প্রচারণার জন্য আর কি চাই ? এরপর তো পিপলি লাইভ‘র নাম স্বাভাবিক ভাবেই ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। আমির খান পাকা জহুরি, রত্ন চিনতে ভুল করেন না কখনো- আনুশা রিজভীর মতো নতুন পরিচালককে চলচ্চিত্র নির্মাণের সুযোগ করে দিয়ে আবারও তিনি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন বলিউডের অন্য সব প্রযোজকদের।

ছবির গল্পে ছোট একটি গ্রামের নাম পিপলি, আর সেখান থেকেই ছবির গল্প শুরু। এই গ্রামের দুই গরিব কৃষক নাত্রা এবং বুদিয়া দুই ভাই। তারা প্রবল খরার কবলে পড়লে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। তারপর ব্যাংকের ঋণের টাকা শোধ করতে না পেরে দুই ভাই যখন পাগলপ্রায় এবং ঋণ শোধ করার কোনো উপায় না পেয়ে তারা যখন হাবুডুবু খাচ্ছে, তখন তারা শেষ ভরসা হিসেবে ছুটে যায় স্থানীয় রাজনীতির প্রভাবশালী ব্যক্তি ভাই ঠাকুরের কাছে। তখন ভাই ঠাকুর নাত্রা ও বুদিয়াকে অপমান করে তাড়িয়ে দেয়। কিন্তু ভাই ঠাকুরের সহকারী এক রাজনৈতিক নেতা তাদের আত্মহত্যা করার বুদ্ধি দেয়। সে দুজনকে বলে, দুজনের কেউ একজন আত্মহত্যা করলে তাদের পরিবার যে ক্ষতিপূরণ পাবে তাতেই শোধ হয়ে যাবে ঋণ, বাড়তি টাকাও থাকবে পরিবারের হাতে। দিশেহারা দুই কৃষক ওই নেতার পরামর্শ অনুসরণ করা ছাড়া উপায় খুঁজে পায় না। এরপর নিজের জমি বাঁচাতে বুদিয়া আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু নাত্রা বড় ভাইয়ের বদলে নিজেই আত্মহত্যা করবে বলে বুদিয়াকে জানায়। এদিকে স্থানীয় পত্রিকার এক সাংবাদিক গ্রামের চায়ের দোকানে চা খেতে বসে পুরো ব্যাপারটা জেনে যায়। এ বিষয়ে জনমত গড়ে তোলার দায়িত্ব কাঁধে নেয়। তার পত্রিকায় নাত্রার আত্মহত্যা নিয়ে একটা প্রতিবেদন লিখে ফেলে। এরপর এই বিষয়টি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভারতের প্রায় সব টেলিভিশন চ্যানেল। অবহেলিত ছোট এক গ্রাম পিপলি থেকে সবগুলো চ্যানেল লাইভ দেখাতে শুরু করে নাত্রা বিষয়ক প্রতিবেদন। এই ঘটনা নিয়ে রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যেও শুরু হয়ে যায় রাজনীতি। সাধারণ এক কৃষক থেকে নাত্রা রাতারাতি জাতীয় রাজনীতির ইস্যূ হয়ে যায়। পিপলি লাইভ ছবির গল্প শুনে মনে হতেই পারে, না জানি কতো গুরুগম্ভীর ছবি। কিন্তু ছবিতে গুরুতর এইসব মানবিক বিষয় তুলে ধরা হয়েছে হাস্যরসের মধ্য দিয়ে।

পিপলি লাইভ ছবির পরিচালক আনুশা রিজভির এটিই প্রথম ছবি। ভদ্রমহিলা পেশায় ছিলেন এনডিটিভির সাংবাদিক। তুখোড় টিভি রিপোর্টার হিসেবে তার পরিচিতি ও খ্যাতি ছড়িয়ে আছে সারা ভারতে। সাংবাদিকতা জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি পিপলি লাইভ ছবিটির চিত্রনাট্য রচনা করেন। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শিত হয়েছে ছবিটি। এর মধ্যে ডারবান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সাড়া ফেলে দেয় পিপলি লাইভ ছবিটি। আর তাই জীবনের প্রথম ছবিটি করেই পরিচালক পেয়ে যান শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার। এছাড়া এবছর অস্কারে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করবে পিপলি লাইভ ছবিটি।

ছবির নাম
পিপলি লাইভ
পরিচালক
আনুশা রিজভী

http://www.sachalayatan.com/aaha_aaha65_yahoo_co_uk/35467

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: