হোজ্জা নাসিরুদ্দিন—জ্ঞানী-নির্বোধ কিংবা নির্বোধ-জ্ঞানীর গল্প!

মূল লেখার লিংক

মধ্য এশিয়ায়, ফারগানা উপত্যকার ঠিক মুখেই খোজেন্দ (Khojend)— সুপ্রাচীন, ঐতিহ্যবাহী, জৌলুসপূর্ণ এক শহর, আর উত্তরের রেশম পথটি ধরে দূর-দূরান্তে চলে যায় যে সব সফরকারী, তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ যাত্রা বিরতি কেন্দ্র। পাশ দিয়ে কুলকুল করে বয়ে চলছে মুক্তো রঙের নদী সির দরিয়া (Syr Darya), তিয়েন শানের বুক থেকে নির্গত হয়ে পড়েছে সেই সুদূর আরলের কোলে। রেশম পথ ধরে খোজেন্দের দিকে আসা পথিকের, কিংবা তাদের উটের, সবার আগে নজরে পড়ে সুবিশাল এক বটবৃক্ষ, সির দরিয়ার তীরে সগৌরবে আকাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে।

গ্রীষ্মের এক তপ্ত দুপুরে, স্তেপের উচ্চভূমি থেকে যখন লু হাওয়া বইছিল, ঘর্মাক্ত দেহে আসে এক মুসাফির, বসে পড়ে সে বটগাছের ছায়ায়। বৃক্ষ শাখার হিল্লোলে সির দরিয়া থেকে আসা ঝিরঝিরে বাতাস পরশ বুলিয়ে দেয় পথিকের দেহে, আবেশে ঘুম এসে যায় তার। অনেকক্ষণ পর বেশ শান্তির এক ঘুম শেষে চোখ মেলে সে।

“খোজেন্দে স্বাগতম, হে মুসাফির।” মিষ্টি হাসে এক লোক, খোজেন্দের অধিবাসী।
“আহ, ধন্যবাদ আপনাকে। চমৎকার বটগাছটি আপনাদের, গর্ব করার মতো।” পথিকও প্রত্যুত্তরে হাসে।
“হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন। এ আমাদের জন্য অনেক বড় উপহার।”
“কিন্তু যেভাবে নদীর পাড় ভাঙছে, আপনাদের কী মনে হয়, আগামী বর্ষাটাও টিকে থাকতে পারবে সে!”
“না, ভেসে যাবে না ও, নদীই বরং থেমে যাবে। শেকড়ের ধারে তার জমবে পলিমাটির নতুন স্তর, নদীর বুক চিরে জাগবে চর। আগের মতোই খোজেন্দের আকাশে ডানা মেলবে সে।” দৃঢ় কণ্ঠে বলে খোজেন্দবাসী।
“কিন্তু ধরুন, এরকম হলো না!” পথিকের চোখে অবিশ্বাস।
“কোনোদিন যদি ঢলেও পড়ে সে সির দরিয়ার তীরে, যদি শুকিয়েও যায় তার বল্কল, ঝরে পড়ে তার পত্র-পল্লব, বন্ধ হয়ে যায় নাড়ির স্পন্দন, তবু খোজেন্দের কোনো কুঠার উঠবে না ওর গায়ে। চারদিকে খুঁটি পেতে তাকে ঘিরে দিব আমরা,” ঘোরের মতো বলতে থাকে খোজেন্দবাসী, “আর দূরান্তের পথিক আগের মতোই জানবে, এটিই সেই গাছ যা লাগিয়েছিলেন হোজ্জা নাসিরুদ্দীন।”
“হোজ্জা এসেছিলেন এখানে!” চিৎকার করে উঠে পথিক। “আহা, কত গল্প শুনেছি তার ব্যাপারে! আমরা, যারা সেই মহাপ্রাচীরের ভেতর থাকি, তাকে অবশ্য বলি এফেন্দি (Efendi)।”

হাসিতে উদ্ভাসিত হয় খোজেন্দবাসী। “শহরের উপকণ্ঠে রাজ্জাক (রুটি-দানকারী) নামে যে মহল্লাটি আছে, সেখানে গেলে তার আরো স্মৃতি দেখবেন। আমরা বলি হোজ্জা নাসিরুদ্দীন মহল্লা, বহুকাল আগে এখানে এসেছিলেন তিনি।”

“আর, ঐ পাহাড়গুলো পেরিয়ে যদি আকাতের দিকে যান,” কী এক আনন্দে বলতে থাকে খোজেন্দবাসী, “দেখবেন পাহাড়ী হ্রদ, ছোট্ট গ্রাম চোরাক, হোজ্জার সেই চা-খানা, আর তার পাশে হোজ্জার বিখ্যাত সেই চড়ুই, হোজ্জা যাদের রুটি খাওয়াতেন, তাদের অসংখ্য বংশধর। হ্রদের কিনারায়, পাহাড়ের গায়ে রয়েছে ‘পুণ্যবান সেই চোরের গুহা’।”
“পুণ্যবান চোরের গুহা!”
“হ্যাঁ, বোগদাদের সেই বিখ্যাত চোর, হোজ্জা যাকে চুরি থেকে ফিরিয়ে পুণ্যাত্মা করে তুলেছিলেন।”

এভাবেই বেঁচে আছেন তিনি, হোজ্জা নাসিরুদ্দীন, বসফোরাস থেকে জাবাল-তারিক, হরমুজ থেকে ভলগা, আনাতোলিয়ার উচ্চভূমি থেকে চীনের মহাপ্রাচীরে, এবং আরও দূরে, পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে। বাংলায় তিনি হোজ্জা বা মোল্লা, আরব ও উত্তর আফ্রিকায় জুহা, আজারবাইজান, আফগান, পারস্যে মোল্লা, আলবেনিয়ায় হোক্সহা, উজবেক-চীনে আফেন্দি বা এফেন্দি, উইঘুরে আফেন্তি, কাজাখে খোজা, বসনিয়ায় হোদজা, তাজিকে মুশফিকি

কিন্তু সত্যিই কি রক্তমাংশের মানুষ ছিলেন তিনি, নাকি এসব নিছকই কিংবদন্তির কথা মাত্র!

কে ছিলেন হোজ্জা?
আফগানিস্তান, পারস্য, তুরস্ক, তাজিকিস্তানসহ মধ্য এশিয়ার সব দেশই তাকে দাবি করে নিজের সন্তান বলে, ছাড় দিতে রাজি নয় কেউ কাউকে। আর উজবেকগণ তো তাদের বুখারা শহরটিকে দেখিয়ে একেবারে জোর গলায়ই বলে থাকে, এটিই হোজ্জার শহর, এখানেই জন্মেছেন তিনি।

বুখারায় হোজ্জা নাসিরুদ্দীনের ভাস্কর্য

হোজ্জা নাসিরুদ্দীনের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রাচীনতম গল্পটি পাওয়া যায় আবুল খায়ের-ই-রুমী’র সালতুক-নামা (Saltuk Nama, ১৪৮০ খ্রি.) গ্রন্থে। এতে জানা যায়, হোজ্জা বর্তমান তুরস্কের উত্তর-পশ্চিমের জেলা শহর আকসেহিরের (Aksehir) তৎকালীন দরবেশ সাঈদ মাহমুদ হায়রানীর একজন সাধক শিষ্য ছিলেন।

তুর্কি ভাষায় রচিত তাঁর আরো কিছু গল্প পাওয়া যায় লামি চেলেবি‘র (Lami Celebi, মৃত্যু ১৫৩১ খ্রি.) গল্পগ্রন্থ লেতাইফ(Leta’if)-এ, যেখানে হোজ্জাকে চতুর্দশ শতকের সাঈদ হামজার সমসাময়িক বলে উল্লেখ করা হয়।

তবে পরবর্তী উপাখ্যানসমূহে পৃথিবী জুড়ে হোজ্জার যে সুবিশাল জনপ্রিয়তা, এবং বিশেষ করে তাঁর উপর ইউরোপীয় গবেষকদের পাণ্ডিত্যের ভিত্তি, গড়ে উঠেছে উসমানী (Ottoman) অভিযাত্রী এবলিয়া চেলেবি (Evliya Celebi)’র বর্ণনার উপর। এবলিয়া সপ্তদশ শতকে আকসেহিরে হোজ্জার তথাকথিত মাজার পরিদর্শন করেন এবং একটি গল্প বলেন যেখানে মঙ্গোল খানাতের সম্রাট, আমির তৈমুর লঙের সাথে হোজ্জার মোলাকাতের একটি ঘটনা তুলে ধরা হয়। তৈমুর মারা যান সির দরিয়ার তীরে, ১৪০৫ সালে।

পরবর্তী শতকগুলোতেও বিভিন্ন বর্ণনায় হোজ্জার খবর পাওয়া যায়। আকসেহিরের সন্নিকটবর্তী এলাকা সিভ্রিহিসারের (Sivrihisar) মুফতি হুসেইন এফেন্দি (মৃত্যু ১৮৮০ খ্রি.) উল্লেখ করেন, হোজ্জা তাঁরই এলাকায় ১২০৮ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১২৮৪ খ্রিস্টাব্দে আকসেহিরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই উৎস অনুসারে, হোজ্জা সিভ্রিহিসারে তাঁর ইমাম পিতার কাছে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন এবং পরে কনিয়া’র হানাফী বিদ্যালয়ে ফিকাহ শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন ও ইমাম হবার যোগ্যতা অর্জন করেন। কনিয়া শহরে মাওলানা জালালুদ্দিন রুমী‘র (১২০৭-১২৭৩) সাথে তিনি সাক্ষাত করে তাঁর কাছ থেকে সুফী দর্শন আয়ত্ত করেন। সাঈদ মাহমুদ হায়রানীর বায়েত গ্রহণ করে হোজ্জা পরে আকসেহিরে গমন করেন এবং বিয়ে করে সেখানে স্থায়ী হন ও কাজীর পদে অভিষিক্ত হন।

ত্রয়োদশ শতকের মাঝামাঝি সময়কার দুটি দানপত্রে কনিয়া শহরে হোজ্জার অবস্থানের উল্লেখ পাওয়া যায়: এদের একটি ১২৫৭ খ্রিস্টাব্দে সাঈদ মাহমুদ হায়রানী কর্তৃক, ১২৬৬-৬৭ খ্রিস্টাব্দে অন্যটি হাজী ইব্রাহীম কর্তৃক।

বিভিন্ন সূত্র বিশ্লেষণ করে মোটামুটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়, হোজ্জা সিভ্রিহিসার এলাকার সন্নিকটে হর্তু গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ত্রয়োদেশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে আনাতোলিয়ায় (Anatolia) বাস করতেন। আকসেহিরে গেলে চোখে পড়ে তাঁর কবরে সুদৃঢ় এক লৌহ দরজা, বিশালাকায় এক তালা ঝুলানো তাতে। দর্শনার্থীদের অবশ্য আশাহত হবার কারণ নেই, কবরের চারপাশে কোনো দেয়াল রাখতে নিষেধ করে গেছেন হোজ্জা! অর্থাৎ ইহলোকে আমরা কত কিছুই না সিন্দুকে পুরে আটকাতে চাই, কিন্তু এর চে ঢের বেশী আমাদের অগোচরেই হারিয়ে যায়।

মাওলানা জালালুদ্দিন রুমীর কবরের পাশে শায়িত এক নারীর সমাধিফলক থেকেও হোজ্জার জীবনী সম্পর্কে জানা যায়। ধারণা করা হয়, ফলকটি হোজ্জার কন্যা ফাতিমার, যিনি ১৩২৬ খ্রিস্টাব্দে মারা যান। এ হিসেবে হোজ্জা ত্রয়োদশ শতকেরই মানুষ ছিলেন।

নাসিরুদ্দীনের গল্প
হোজ্জার নামে পৃথিবীর আনাচে আনাচে ছড়িয়ে থাকা গল্পগুলো জড়ো হতে থাকে পঞ্চদশ শতক থেকে। কিন্তু গ্রন্থাকারে সেগুলো প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে, ইস্তাম্বুলের রাজকীয় ছাপাখানায়, লেতাইফ-ই-হাসে নাসরেদ্দিন বা ‘খোদজা নাসরুদ্দিনের মনোরম গল্প” শিরোনামে। তাঁর প্রথম ক্ষু্দ্রাকৃতির প্রতিকৃতিতে দেখা যায় গাধার পিঠে উল্টো হয়ে বসে আছেন তিনি। প্রতিকৃতিটি বর্তমানে টপকাপি (Tokapi) প্রাসাদের জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।

তুরস্ক থেকে দ্রুত উসমানী সাম্রাজ্যের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে হোজ্জার গল্প। পারস্য ও আরব লোকগাঁথায় হোজ্জা অমর এক চরিত্র। পৃথিবীর বহু জায়গার সংস্কৃতির সাথে একেবারে নিবিড়ভাবে মিশে গেছেন তিনি, দৈনন্দিন জীবনের ঘটনা প্রবাহে, আনন্দ-বেদনায়, আশা-হতাশায়, ক্ষোভে-দ্রোহে নিরন্তর তাঁকে আহ্বান করে মানুষ। হাজার হাজার তাঁর গল্প, বলে গেছেন তিনি সব মানুষেরই কথা, যা খাপ খেয়ে যায় যেকোনো জায়গায়, যেকোনো ঘটনায়। আলবেনিয়, আরবি, আজেরি, বাংলা, বসনিয়, হিন্দি, পশতু, সার্বিয়, উর্দু প্রথায় তিনি খুব আপনজন, ক্রোয়েশিয়, ককেশীয়, এমনকি চীনা ভাষায়ও।

আপাতদৃষ্টিতে হোজ্জার অধিকাংশ গল্প কৌতুক বা চুটকি হিসবে গণ্য করা যায়। ক্লান্তিহীনভাবে মানুষ এগুলো বলে যায়, কায়রোর নৈশ বাজারে, পারস্যের সরাইখানায়, ভলগার তীরে, …। একটু গভীরে প্রবেশ করলেই দেখা যায় তাঁর গল্পের দ্বৈতরূপ: যুক্তিহীন তবু যুক্তিবাদী, বিবেচনারহিত তবু সুবিবেচনাপ্রসূত, পাগলাটে অথচ স্বাভাবিক, বোকা অথচ তীক্ষ্ণ, এবং সরল অথচ সুগভীর। প্রথাবিরুদ্ধ কিন্তু কার্যকরভাবে গভীর সারল্যে স্রোতার মনে তিনি প্রোথিত করে দেন তাঁর বক্তব্য, অনন্য উপায়ে।

কোথায় ঘুমিয়ে আছেন হোজ্জা?
যদিও মোটামুটি গ্রহণযোগ্য মতে আকসেহিরেই চির নিদ্রায় শায়িত হোজ্জা, তবু দাবি ছাড়তে রাজি নয় অন্যরা। পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে আটটি জায়গায় তাঁর কবরের কথা শোনা যায়। কে জানে এদের কোনটিতে ঘুমিয়ে আছেন তিনি? অথবা আসলে এদের কোনটিই নয়, অন্য কোথাও, হয়তো সাগরতলে, পাহাড়-কন্দরে কিংবা মরুর বুকে!

তবে আদৌ ঘুমিয়ে আছেন কি তিনি! এখনও কি মানুষ গভীর ভালোবাসায় পথ চলে না তাঁর পাশে? দামেস্ক তলোয়ারের মতো এখনও কি তাঁর ব্যঙ্গ, শাণিত তাঁর বিদ্রুপ আঘাত হানে না দুর্নীতিবাজ, গোঁড়া, অত্যাচারীর পাজরে?

হোজ্জার কিছু গল্প
১। একদা শিষ্যদের নিয়ে মেলায় গেলেন হোজ্জা। এক জায়গায় দেখতে পেলেন তীর নিক্ষেপ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে। খেলায় অংশগ্রহণ করে প্রথম তীরটি নিক্ষেপ করলেন হোজ্জা। কিন্তু তীর গিয়ে পড়ল মাত্র কয়েক হাত দূরে। সবাই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে দেখে হোজ্জা বললেন, “আসলে এমনটি ঘটে সে মানুষের ক্ষেত্রে যে নিজেকে সবসময় ছোট ভাবে।”

“আর এমনটি ঘটে…” তীর নিক্ষেপ করেন হোজ্জা। নির্ধারিত জায়গার উপর দিয়ে বেশ দূরে গিয়ে পড়ে তীরটি এবার, আবারও হাসতে থাকে জনতা। “..এমনটি ঘটে যে মানুষ উদ্ধত আত্মবিশ্বাসে ভুগে, তার ক্ষেত্রে।”

“আর এ হচ্ছে…”আবারও তীর নিক্ষেপ করেন হোজ্জা, ঠিক জায়গামত বিদ্ধ হয় এবার। হোজ্জা শান্ত গলায় বলেন, “এ হচ্ছে আমি।”

২। হাটবারের দিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে জড়বুদ্ধির মতো আচরণ করতেন হোজ্জা, ফলে নির্বোধ ভেবে মানুষ তাকে মুদ্রা দান করত। কিন্তু তার সামনে দুটি মুদ্রা তুলে ধরা হলে, সর্বদাই তিনি ছোট মুদ্রাটি গ্রহণ করতেন, যতবারই, যেভাবেই দেয়া হোক না কেন।

একদিন সদাশয় এক ব্যক্তি তাকে বললেন, “নাসিরুদ্দীন, তুমি তো বড় মুদ্রাটা নিতে পার। এতে তোমার দ্রুত বেশ কিছু টাকা-পয়সা জমে যাবে আর মানুষও আগের মতো তোমাকে নিয়ে তামাশা করতে পারবে না।”

“হুমম, আপনি যা বলছেন তা হয়তো ঠিক হতে পারে। কিন্তু আমি ভাবছি, আমি যদি সবসময় বড় মুদ্রাটা গ্রহণ করি, তাহলে মানুষ আমাকে তাদের চেয়েও নির্বোধ ভেবে যে আনন্দটা পায়, সে আনন্দটা আর পাবে না, ফলে দান হয়তো একেবারেই বন্ধ করে দিবে।” হোজ্জা জবাব দেন।

৩। “আমি যখন মরুভূমিতে ছিলাম,” এক স্মৃতিচারণায় বললেন হোজ্জা, “তখন রক্তলোলুপ, নৃশংস একদল বেদুইনকে দৌঁড়িয়েছিলাম।”
“খালি হাতে!” বিস্ময়ে প্রশ্ন করে দর্শক।
“হ্যাঁ, কেবল ছোট একটা লাঠি ছিল আমার হাতে।”
“কিন্তু এ কীভাবে সম্ভব, হোজ্জা!”
“খুবই সহজ। আমি ঝড়ের বেগে দৌঁড়াচ্ছিলাম, আর তারাও আমার পেছন পেছন দৌঁড়াচ্ছিল।”

৪। গোধূলি বেলায় নির্জন মরুপথে একাকি হাঁটতে হাঁটতে হোজ্জা দেখলেন ধূলিঝড় উঠিয়ে একদল ঘোড়সওয়ার আসছে তার দিকে। চিন্তার ঝড় খেলতে লাগল তাঁর মনে, কল্পনায় তিনি নিজেকে দেখতে লাগলেন বন্দী, ডাকাতির শিকার কিংবা নিহত অবস্থায়। উৎকণ্ঠায় হৃদপিণ্ড তাঁর গলায় উঠে আসার উপক্রম হলো। দ্রুত এক কবরস্থানের দেয়ালে বেয়ে অন্যপাশে চলে গেলেন তিনি, তারপর খোলা এক কবরে মরার মতো পড়ে রইলেন।

তার এই অদ্ভুত ব্যবহার লক্ষ করল ঘোড়সওয়ারগণ এবং অনুসরণ করে তার কাছে এসে পড়ল। হোজ্জা তখন ভয়ে কাঁপছেন।
“এই কবরে আপনি কী করছেন? আমরা দেখলাম আপনি দৌঁড়ে চলে গেলেন। আমরা কি কোনো সাহায্য করতে পারি আপনার?” কোমল গলায় দলনেতা জানতে চান।
“আপনি একটি প্রশ্ন করেছেন, তার মানে এই নয় যে এর সরল-সোজা কোনো উত্তর আছে।” বিপদ কেটে গেছে বুঝতে পেরে হোজ্জা বলতে লাগলেন। ” আসলে ব্যাপারটি নির্ভর করে দৃষ্টিভঙ্গির উপর। আর যদি সত্যি সত্যি জানতে চান, তাহলে বলি, আমি এখানে এসেছি আপনাদের কারণে, আর আপনারা এখানে এসেছেন আমার কারণে।”

৫। কাজী থাকাকালীন একদা নিজের কক্ষে বসে কাজ করছেন হোজ্জা। এমন সময় এক প্রতিবেশি এসে বললেন, “আচ্ছা, হোজ্জা, একজনের গরু যদি আরেকজনের গরু মেরে ফেলে, এর বিধান কী? প্রথম গরুর মালিক কি এতে দায়ী হবে?”
“এটা আসলে নির্ভর করে…।”
“আচ্ছা, তাহলে খুলেই বলি, আপনার গরুটা আমার একটা গরুকে মেরে ফেলেছে।”
“ওহ! সবাই জানে একটা গরু কখনো মানুষের মতো চিন্তা করতে পারে না, তাই গরুর কোনো বিচার হতে পারে না, আর এর মানে হচ্ছে, গরুর মালিকও দায়ী হতে পারেন না।”
“আমি আসলে একটা ভুল করেছি, হোজ্জা। আমি বলতে চাচ্ছিলাম আমার গরুটা আপনার গরুকে মেরে ফেলেছে।”
নাসিরুদ্দীন কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করেন। তারপর বলেন, “একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখলাম, বিষয়টা আসলে প্রথমে যেরকম ভেবেছিলাম, অতটা সহজ নয়।”
তারপর কেরাণীর দিকে ফিরে নির্দেশ দিলেন, “তোমার পেছনে বইয়ের তাক থেকে মোটা বইটা পেড়ে নিয়ে আস তো।”

কিছু মজার তথ্য :)
১। একজন তুর্কিকে চেনার কার্যকর উপায় হচ্ছে হোজ্জার নাম শুনলেই তার হাসি আসে কি না।
২। ইউনেস্কো ১৯৯৬-১৯৯৭ সালকে আন্তর্জাতিক হোজ্জা বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করে।
৩। প্রতি বছর ৫ থেকে ১০ই জুলাই আকসেহিরের আন্তর্জাতিক হোজ্জা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
৪। মিগুয়েল দ্য সারভান্তেসের বিখ্যাত উপন্যাস ডন কুইক্সোট (Don Quixote)-এ হোজ্জা কাহিনীর বেশ ছাপ আছে।

তথ্যসূত্রঃ
১। Click This Link
২। http://en.wikipedia.org/wiki/Nasrudin
৩। বিমুগ্ধ আত্মা হোজ্জা নাসিরুদ্দিন, সেবা প্রকাশনী

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: