চন্দ্রমুখী এক কন্যা ও পাশ্চাত্য মানবিকতার গল্প

প্রতিদিন সন্ধ্যায় সূর্যটা যখন পশ্চিমে ঢলে পড়ে, ঠিক তখন সে নাঁচতে নাঁচতে ঘর থেকে বের হয়। নগ্ন পায়ে ঘাসের উপর নাঁচতে নাচঁতে প্যারিস ফেল্টনার মুগ্ধ হয়ে দেখে আকাশে চাঁদ ও তারাদের উদয়। ‘চাঁদ আমার জন্যে নিরাপদ…আমি চাঁদ ভালোবাসি…’ এখন বলতে পারে প্যারিস।
শেষ রাতের প্রার্থনার পর প্যারিস রোজ বাবা-মাকে বলে, ‘অনেক বড় ভালোবাসি তোমাদেরকে….চাঁদের মত বড়….’।
তার বয়সী অন্য সব মেয়ের মতই প্যারিস ফেল্টনারও বড় হয়ে রাজকন্যা হতে চায়। কিন্তু প্যারিস অন্য শিশুদের মত নয়। সে একজন নিশুতি কন্যা।

১৯৯৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে টড ও জেনিফার ফেল্টনার দম্পতির ঘর আলো করে জন্ম নেয় ফুটফুটে এক শিশু, প্যারিস। নতুন অতিথিকে নিয়মিত হাসপাতালে নেয়া, তার জন্যে খেলনা কেনা, তার সাথে খেলা করে কেটে আনন্দে কেটে যাচ্ছিল ফেল্টনার দম্পতির সময়। বয়স তিন মাস হলে হঠাৎ প্যারিসের হাত, পা ও মুখে ছোট্ট ছোট্ট কালো বিন্দু দেখা দেয়। মা জেনিফার ভেবেছিল এগুলো অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু বয়স যখন নয় মাস, তখন ডাঃ রবার্ট ডাউসি সন্দেহ করলেন। ডাউসি তাকে পাঠিয়ে দেন সল্ট লেক সিটি’র চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ ওয়েন্ডি ম্যাটিসের কাছে।

সবকিছু পরীক্ষা করে; প্যারিসের বাবা মাকে এক রুমে বসিয়ে রেখে একগাঁদা বই নিয়ে ম্যাটিস চলে গেলেন অন্য রুমে। ২ ঘন্টা পর ফিরে এসে জানালেন, ‘আমার মনে হয় এটা এক্সপি…..জেরোডার্মা পিগমেন্টোসাম (Xeroderma Pigmentosum)’. প্যারিসের বাবা-মা ডাক্তারের কথা বিশ্বাস করতে চায়নি। দুঃস্বপ্নেও তারা এমন ভয়ানক সংবাদ কল্পনা করেনি।

যতদিন না বায়োস্পির রেজাল্ট জানা যায় ততদিন সতর্ক থাকতে হবে। প্যারিসকে ভুলেও যেন সূর্যের আলো স্পর্শ না করে সে ব্যবস্থা করতে হবে। ঘরে ফেরার সময় তাই বিষন্ন বাবা-মা কালো পর্দা কিনে আনে। কালো পর্দায় ঢেকে গেল প্যারিসদের দরজা, জানালা।

প্রায় পাঁচ মাস পরে একটি ফোন এলো। ফোনের ওপাশে ডাঃ ম্যাটিস। জেনিফার শুধু একটি শব্দই শুনলেন ‘পজিটিভ’। ফোনটা পড়ে গেল স্তব্ধ জেনিফারের হাত থেকে।

এক্সপি- এমন একটি জেনেটিক ব্যাধি যার কোন চিকিৎসা নেই। এই রোগে আক্রান্ত মানুষের ত্বক সূর্যালোক সংবেদী। এটি একটি বিরল ব্যাধি যা সাধারণত কয়েক মিলিয়ন মানুষের মধ্যে একজনের হয়ে থাকে এবং এর অমোঘ পরিণতি- স্কিন ক্যান্সার।

অন্ধকার নেমে আসে টড ও জেনিফারের ঘরে। অতিবেগুনি রশ্মি প্রতিরোধক প্লাস্টিকের কালো পর্দায় ঢেলে গেল প্যারিসদের বাড়ির সব দরজা, জানালা। টড ও জেনিফার চাকরি বদলে তাদের শিডিউল এমনভাবে তৈরী করলো যেন রাতের বেলায় তারা প্যারিসকে সঙ্গ দিতে পারে। প্যারিস এখন আর দিনের বেলায় ঘরের বাইরে যায় না। রাতে যে জায়গুলোতে ফ্লুরোসেন্ট বা হ্যালোজেন বাতি নেই কেবল সেই সব জায়গায় যায়।

প্যারিসের বয়স যখন ১৮ মাস, তখন একদিন টড জানতে পারেন ভার্জিনিয়ায় একটি প্রতিষ্ঠান আছে যারা সুর্যালোক প্রতিরোধী কক্ষ তৈরী করে। কিন্তু মুশকিল হলো একেকটি কক্ষের দাম পড়বে ২০০০ মার্কিন ডলার!

প্যারিসের অন্ধকার জীবনকে আলোয় ভরিয়ে দিতে এগিয়ে এলো এলাকাবাসী। তারা শহরে র‌্যালি করে তুলে আনলো ৫০০০ ডলার।
প্যারিসের স্কুল ওয়াশিংটন এলিমেন্টারি ও মর্মন টেম্পল (সানডে স্কুল) কর্তৃপক্ষ কালো পর্দায় ঢেকে দিল তাদের সব জানালা দরজা। এগিয়ে এলো নগর কর্তৃপক্ষ। যে পথ দিয়ে প্যারিস স্কুলে যাতায়াত করে সেই পথের সব বাতি বদলে এমন বাতি লাগানো হলো যা প্যারিসের জন্যে ক্ষতিকর নয়।

প্যারিসের প্রতিবেশীরা নিজেদের ঘরের দরজা ও জানালা ঢেকে দিল কালো পর্দায়। যদি কখনো প্যারিস বেড়াতে আসে এই ভাবনায়!
২০০২ সালের গ্রীষ্মে এলাকাবাসীর আয়োজনে একটা র‌্যালি হলো। তারা অর্থ সংগ্রহ করে প্যারিসদের বাড়ির সাথে তৈরী করলো একটি ইনডোর প্লে-গ্রাউন্ড। এই প্লে গ্রাউন্ডে তৈরী হলো সুইং সেট ও সুইমিং পুল; আর প্লে গ্রাউন্ডের পুরো ছাদ জুড়ে অঙ্কিত হলো সাদা মেঘ ও নীল আকাশ।

প্যারিস, উচ্ছ্বল শিশুটি এখন চাঁদের সখী। চাঁদ আর তারাদের আলোয় ভরে উঠে তার প্রতিটি রাত।

পশ্চিম দুনিয়ার মানুষগুলোর যে মানবিকতাবোধ প্যারিসের জীবনে আলো ফিরিয়ে দিয়েছে সেটা কি আমরা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারি বাংলাদেশে এমনকি প্রাচ্যের অন্য কোথাও?

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: