হুদাই ৮: চুল তার কবেকার

১.

ছোটবেলায় দাদীর কাছে একটা ঘটনা শুনেছিলাম। পাত্রী পছন্দ করতে গেছে প্রতিবেশী কোন পাত্রের পরিবার; অভিজ্ঞ কনসালট্যান্ট হিসেবে দাদীও গেছেন অনুরুদ্ধ হয়ে। গ্রামের বাড়ী, সময়টাও বহু আগের। কাজেই আক্ষরিক অর্থে মেয়ে-দেখার সবরকম কার্যক্রম নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হচ্ছে। সব ভালো হলে তো আর ঠিক শান্তি পাওয়া যায় না, তাই দাদী মেয়ের চুলের গোছা দেখতে চাইলেন। ঘোমটা সরাতেই দেখা গেলো তেল চকচকে পুরুষ্ট খোঁপা; আঁটোসাঁটো বাঁধাকপির মতো ঘাড়ের ওপর বসে আছে। দেখে সবাই সন্তুষ্ট হলেও দাদীর মনে খুঁতখুঁতানি রয়েই গেলো। কাছে গিয়ে খোঁপা ধরে দিলেন টান। উন্মুক্ত কেশভার ছড়িয়ে পড়তেই ভেতর থেকে খোসাসুদ্ধ আস্ত সুপারি খসে পড়লো মেঝেতে। ব্যাস, এহেন তঞ্চকতার ক্ষতিপূরণ হিসেবে পাত্রপক্ষের জন্য বরাদ্দ হলো বাড়তি আরেকদিনের আপ্যায়ন।

কপাল ভালো, "দিন বদলাইছে"। পার্লারের নাপতানী নানাবিধ কায়দাকানুন ও উপকরণে স্বল্পদৈর্ঘ্যের চুলেও শক্তপোক্ত কবরী রচনা করতে সক্ষম। পাত্রীর চুলের দৈর্ঘ্য অথবা গোছের খোঁজ আর নেয় না কেউ, বরং জানতে চায় হেয়ারডুর চার্জ কতো পড়লো।

২.

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমাদের আট বান্ধবীর জোটে একজনের সাজপোশাক ছিলো বাকী সাতজনের চেয়ে আলাদা। আমাদের সপ্তমূর্তির অনেক কিছুই সে ঠিক পছন্দ করতো না, তবু সঙ্গী হিসেবে কীভাবে যেন অনুমোদন করে নিয়েছিলো। পথের ধারে নির্মাণকাজের বালিরাশি দেখলে পা ডুবিয়ে দিচ্ছি, দুই ফিতার পাতলা স্যান্ডেলে চটাস চটাস শব্দ তুলে হাঁটছি, লাইম ফ্লেভারের বিকট সবুজরঙা ললি খেয়ে জিভদাঁত সবুজ করে ফেলছি– এসব দৃশ্যে লুনার কুঞ্চিত নাকমুখ দেখে দেখে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। গা-সওয়া হয়ে গিয়েছিলো বাকীদের তুলনায় ওর অস্বাভাবিক "পশ" চলনও। শুধু সয়ে নিতে পারিনি তার খালেদা জিয়া মার্কা ফোলানো চুলের স্টাইলটি। ক্লাসের সবাই ঠাট্টা করতো এটা নিয়ে, আমরা সাতজনও বহুবার বহু কায়দায় বলে দেখেছি, কাজ হয়নি।

ফার্স্ট ইয়ার থেকে একই কথা বলতে বলতে থার্ড ইয়ারে উঠে আমরা হাল ছেড়ে দিলাম। তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী থেকে বিরোধীদলীয় নেত্রীতে অবনমিত খালেদা ম্যাডাম নবতর রূপসজ্জার অংশ হিসেবে প্রকৃতিপ্রদত্ত ভ্রূ নির্মূল করে দুই গণ্ডদেশের কেন্দ্রে কম্পাসের কাঁটা বসিয়ে ঊর্ধ্বমুখে দু’টি বৃত্তচাপ অঙ্কন করলেন। সেরকম কারুকর্মের পরীক্ষানীরিক্ষা না চালালেও লুনার কপালের ওপর ফাঁপানো কেশস্তূপের পুরুত্ব বাড়লো বই কমলো না। তখন একদিন ওর সঙ্গে ফ্যাকাল্টিতে ঢুকছি, প্রচণ্ড বৃষ্টির কারণে অন্য ডিপার্টমেন্টের সিঁড়ি ধরে তড়িঘড়ি এগোচ্ছি। করিডোরে বেশীরভাগ অচেনা মুখ। থামের আড়াল থেকে উঁকি দেয়া মুখে এক বিশ্ব বিস্ময়। আচমকা ছুটে আসে অবিস্মরণীয় বিস্ফোরক মন্তব্য: বা-আ-জি, মাতা ইবার মিদ্যে খি ডুকাইয়্যে!!! বন্ধুর দুর্গতিতে নাকি হাসতে নেই, শাস্ত্রবাক্য মানা সম্ভব হয়নি সেদিন।

৩.

অনেকদিন পর সেদিন টিভি দেখতে বসেছি। ভোর সকালে আগের দিনের অনুষ্ঠানের পুনঃপ্রচার চলে। রান্না দেখাচ্ছেন কেউ। "রেসিপির প্রণালীটা আরেকবার রিপিট করে দেখাচ্ছি", যথাস্থানে বাংলা প্রতিশব্দের পাশাপাশি যথাযোগ্য মর্যাদায় অ্যান্ড-বাট-সো-দেনের উচ্চারণ। উপস্থাপক দিতির উচ্চতা অন্তত তিন ইঞ্চি বাড়িয়ে দিয়েছে মাথার ওপর তৈরি কেশপর্বত। খালেদা জিয়া জিন্দাবাদ।

ধুত্তোর, এর চেয়ে খবর দেখা ভালো। সক্কাল বেলাতেই গোটা দিনটা মাটি করতে চাইলে এই সংবাদ পরিবেশনা দেখা অথবা শোনা ফরজ। লাইন ধরে আসছে তিনজনকে কুপিয়ে হত্যা, গরম পানিতে বধূ ঝলসানো, ভাগাড়ে নবজাতক উদ্ধার, পার্কে ধর্ষণের চেষ্টাকালে জনতার হাতে উদ্ধার ছয় বছরের শিশু। এ পর্যায়ে টিভিপর্দায় চোখ না রেখে পারা গেলো না। আমাদের দেশে শোকাতুরা জননীকে চ্যানেলের লোগোযুক্ত মাইক্রোফোনধারী বিশেষ প্রতিনিধি "আচ্ছা আপনার ছেলে যে মারা গেলো তাতে আপনার প্রতিক্রিয়া কী"– গোছের প্রশ্ন করে ফেলেন অবলীলায়। তারপরও বলতেই হয়, আমরা অনেক কিছু শিখেছি পশ্চিমা মিডিয়ার কাছ থেকে, ভিকটিমের মুখটুকু এখন ঝাপসা করে দিতে জানি। থানায় বসা বস্তিবাসী রিকশাচালক-গৃহকর্মী দম্পতির শিশুকন্যাটিকে করা ইন্টারভিউটি এরকম:
তুমি কোথায় গেছিলা-
তারপর কী হইলো-
কোন্ লোকটা-
তুমি তাকে চিনো-
সে কী বললো-
তুমি কী বললা-
তখন সে কী করলো-
তুমি কী করলা-
তোমার এখন কেমন লাগতেছে-
তুমি কী চাও-
……………….

স্পঞ্জের স্যান্ডেল, ময়লা লাল পাজামা, নেতানো সিনথেটিক জামা হয়ে ঝাপসা-করা মুখে ক্যামেরা স্থির হয়। ভয়ার্ত শিশুটি ঠিকমতো গুছিয়ে কথা বলতে পারছে না, তার ডানহাত মাথার ওপর তোলা। আঙুলগুলো পাকিয়ে ধরছে মাথার তালুর চুল, প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে উপড়ে আনছে একের পর এক গুছি। সে অংশটি ঝাপসা-সীমার বাইরে, প্রায় দেড় মিনিটের কথোপকথনের পুরোটা সময় (সম্পাদিত দৈর্ঘ্য) জুড়ে স্পষ্ট দেখা গেলো, একই কাজ করে চলেছে শিশুটির হাত।

সবে এক চ্যানেলের প্রতিনিধি গেলেন। আর কেউ আসুক না আসুক, ট্রাইকোটিলোম্যানিয়ার আদর্শ উদাহরণ হিসেবে তখনই মনোরোগবিশেষজ্ঞ এই শিশুটিকে শনাক্ত করতে পারবেন বলে অনুমান করি।

আনুষ্ঠানিকভাবে আসামী শনাক্তকরণ, প্রাথমিক তদন্তে সাক্ষ্য প্রদান ইত্যাদি কাজে অপরাধের ভিকটিম থানাপুলিসের চৌহদ্দিতে থাকতেই পারে। এ ধরণের ঘটনায় কাউন্সেলিং অপরিহার্য; দৃশ্যমান অত্যাচারের চরম সীমা অতিক্রান্ত না হলে, অথবা মানবাধিকার সংগঠনের নজরে না এলে আমাদের পোড়া দেশে এমন কিছু আশা করাটা বোকামি। পুলিসের সচেতনতা আশা করা ততোধিক মূর্খতা; বোঝাই যায় ক্যামেরাবন্দী হওয়ার উছিলা পেয়ে তারা মহাখুশি। বাকী থাকে টিভি চ্যানেল। অমুক ফোন সংবাদ শিরোনাম কিংবা তমুক ইন্সুরেন্স অপরাধের খবরের অর্থায়ন হালাল করতে এই নির্মম ইন্টারভিউর ছোটলোকিটুকু না করলে তাদের চলতো না?

http://www.amrabondhu.com/nushera/1881

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: