বিটিভির ছায়াছন্দ:কমন পড়ে?- বিজ্ঞাপন বিরতির পর

জন্মদিন-সঙ্গীতে নায়কের হাতে গিটারের বদলে দোতারা থাকলে বেশী মানাতো– এইরকম ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে দেখবেন গ্রামের দৃশ্য হাজির। বিড়িফোঁকা কুচকুচে ঠোঁটে কড়া লিপস্টিক মাখা নায়কের ওষ্ঠাধরের “কারুকাজ” দেখলে বোঝা যাবে ইনি ফারুক। সঙ্গে কবরী থাকলে “সব সখীরে পার করিতে নেব আনা আনা”। আর শহুরে সাজের গ্রামের মেয়ে নীপা মোনালিসা থাকলে “তুমি আমার মনের মাঝি”। বলতেই হবে, ফারুকের হাতে বৈঠাটি খুবই মানানসই বস্তু। “সারেং বউ”তে প্রোমোটেড হয়ে লঞ্চের স্টিয়ারিং পেয়ে যান তিনি।

খান জয়নুলের “তুফান মেল” থাকবে একমাত্র কমিক রিলিফ হিসেবে। নইলে রবিউল, টেলিসামাদ, অথবা দিলদার। প্রথমজনের ফোকলা দাঁতের হাসি বা দ্বিতীয়জনের ইকড়িমিকড়ি চুল দেখার আগেই দর্শক হাসতে শুরু করবে, আর শেষজনের লুঙ্গি নাচানো আতংকজনক পর্যায়ে চলে যাবে।

“মা আমার সাধ না মিটিল আশা না পুরিল” এধরণের পুরনো ক্লাসিক গান খুরশিদ আলমের “ত্তুলোওনা ম্মেলেইনা তার” কণ্ঠে শোনা গেলে বুঝবেন চিরায়ত শরৎ-সাহিত্যের চাষী নজরুলীয় বা রাজ্জাকীয় চলচ্চিত্ররূপে নায়করাজকে দেখা যাচ্ছে।
“মদদ করো হে আল্লাহ, আমি অভাগিনী দুদিন খাইনি” ইত্যাকার লিরিকসসমৃদ্ধ একটা গান থাকবে দুনিয়ার কঠিন বাস্তবতা, মানুষের হৃদয়হীন নিষ্ঠুরতা এইসব নিয়ে। সামাজিক অ্যাকশান সিনেমার শুরুতেই শিশু নায়ক/নায়িকাকে কোলে নিয়ে ম্যানেজারের চক্রান্তে সদ্য বৈধব্যপ্রাপ্ত ধনীগৃহিনীর পথে নেমে আসা উপলক্ষ্যে এই গান চিত্রায়িত হয়ে থাকবে। অমুকতমুক বাবার দরগায় নকল দাড়িগোঁফের জঙ্গল পরা পীরবাবা আর তার গাঞ্জালদলের পরিবেশনায় মাজার-সঙ্গীতও থাকতে পারে। আরেকটা গান হবে ভিলেন তথা আন্ডারওয়ার্ল্ড ডনের আন্ডারগ্রাউন্ড আস্তানায়। নায়ক বাঁধা হাতপা নিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকবে আর নায়িকা ইঙ্গিতপূর্ণ কথা ও উত্তেজক নৃত্য সমন্বয়ে কদাকার ভিলেনদের চোখে ধূলা দেয়ার চেষ্টা করবে। উদাহরণ, “কালো চোখের তারাতে/ বলছি তোমায় ঈশারাতে/ মেরোনা ছুরি এই বুকেতে”। মদের বোতল, তাসের প্যাকেট, পরিত্যক্ত কিছু কার্ডবোর্ডের বাক্স, কেরোসিনের টিন, পুরনো টায়ার ইত্যাদি এই সেটের অপরিহার্য উপাদান।

এক পর্যায়ে কস্টিউম ড্রামার প্রবেশ ঘটবে। রাজপ্রাসাদ, রাজারানী, সাপখোপ, অভিশাপ, বনবাস– সবই থাকবে এমন গানে। রোজিনা, অঞ্জু ঘোষ, ওয়াসিম, উজ্জ্বল, জাভেদ, সুব্রত প্রমুখের উপস্থিতির সম্ভাবনা উজ্জ্বল। শিসমহল, সতী নাগকন্যা, চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা, আবেহায়াত, কমলার বনবাস– এমন সব ছবি। এসব গানে কুৎসিত অ্যাংগেলের ইস্তেমাল একেবারে ডালভাত। নায়করা অবধারিতভাবে পরচুলা আর নকল গোঁফ ব্যবহার করবে, যে চুল শত ঝড় তুফানেও উড়বেনা, বড়জোর কপালের উপর এক গোছা একটু আলগা হয়ে যাবে। তাদের পোশাকে এলভিস প্রিসলির ছাপ থাকলেও হান্টিং বুট আর গানবেল্টের বিকট কম্বিনেশনও দেখা যাবে।

গানের কথা যদি এমন হয়, “কী রূপ তুমি দেখাইলাগো তোমার শিসমহলে, রূপের আগুন ঝলমল ঝলমল করে…” তাইলে বুঝবেন নায়িকার নাম রোজিনা। গালের মাঝখানে বিরাট বড় এক তিল, যদিও মাছি বসেছে বলে ভুল হয়। মাথায় বেলি-ড্যান্সারের মতো নামকাওয়াস্তের টুপি-ঘোমটা থেকে শখানেক রুড গুলিতীয় বেনী বের হয়ে আছে, কপালের উপর ঝুলন্ত পুঁতির লহর। ঘাগরা-জাতীয় এক পোশাক, দর্জির কারিশমায় যেটা স্রেফ আয়না বসানো ঝকমকে শায়া-ব্লাউজ। এই জাতীয় গানে নায়িকার পিছনে জনাদশেক স্থূলদেহিনী ততোধিক স্থূল ভঙ্গিতে কুর্দন চালিয়ে যাবেন। বিশেষ অস্বস্তিকর এই ভঙ্গিমার কারণে দুষ্টলোকেরা একে ঝাঁকিনৃত্য বলে থাকে ।

কোমরের বিছা আর কাঁখে-ধরা কলসিসহ নায়িকার মধ্যপ্রদেশ দেখিয়ে গান শুরু হলে বুঝতে হবে ইনি অঞ্জু ঘোষ, “পিতলের কলসি হইলে হাইরে তোমাকে কাঙ্খে নিতাম/ সোনারি আংটি হলে হাইরে তোমাকে কিনে নিতাম”। আর নায়িকার গগনবিদারী বীণ শুনে (!) পাহাড়- সমুদ্র-অরণ্য ভেদ করে ছুটে আসা গোখরা যখন অবশেষে নায়িকার সামনে আসবে, দুর্ধর্ষ কিং-কোবরাকে হঠাতই সরু সূতলি-সাপের মতো দেখাবে। নায়িকার যা সাইজ তাতে অজগর হলেই ভাল মানানোর কথা; কিন্তু অজগর তো আর ফণা তোলেনা, কোমা-তে থাকা নায়কের বিষ তুলবে কীভাবে!

বিদেশে চিত্রায়িত দুএকটা গান থাকবে; সিনেমার নাম হবে লাভ ইন সিংগাপুর/ ব্যাঙ্কক/ আমেরিকা, নেপালী মেয়ে, মিস লংকা ইত্যাদি। গানের কথায় এইটা যে বিদেশ-রিলেটেড সিনেমা তা বুঝিয়ে দেয়া হবে। উদাহরণ, “ওগো সিংগাপুরি মেম তুমি করবা নাকি প্রেম”, “চুরি করেছ আমার মনটা হায়রে হায় মিস লংকা”, “আমি নেপালী মেয়ে ও বাবুজি বাঙালী মন বুঝিনা”।

উইগ সামলাতে ব্যস্ত সোহেল রানা সন্তর্পনে হেঁটে হেঁটে গাইবেন, ভালোবাসার মূল্য কতো! তার পরপরই হাস্যকর জাম্পসুট পরে আফজাল-দিতি এসে “তুমি আজ কথা দিয়েছ”র তালে তালে নাচবে (বিমার ভাষায় পিটিনৃত্য); আফজাল অবশ্য নাচের চেয়ে দৌড়াবে বেশী। তবু এতোক্ষণে খানিক স্বস্তি। এর পরই আসবে বুকের কাছে প্যান্ট তোলা, সদাসর্বদা এক কাঁধ উঁচানো, এক হাঁটু ভেঙ্গে দাঁড়ানো বিকট মুখভঙ্গি আর উদ্ভট হেয়ারকাটের ওমর সানী। তার ক্রোড়চারিনী মিষ্টি মেয়েটি বাস্তব জীবনে কীভাবে তার মুখ দেখে প্রতিদিন ঘুমাতে যায় আর ঘুম থেকে জেগে ওঠে, এই রহস্যের সমাধান করতে করতে পরের গান। রংবেরঙের পতাকা-শোভিত শিশুপার্কে যথার্থ স্মার্ট সালমান শাহ্ আর প্রাণপণে আধুনিক হতে চাওয়া শাবনূরের রসায়ন চলবে, “এইদিন সেইদিন কোনদিন তোমায় ভুলব না”। উল্লেখ্য, এইসব দ্বৈত-গানের বেশীরভাগই শুরু হবে নায়িকার ঘনঘন চোখ পিটপিটানিসহ হাঁপানিরোগীর মতো শ্বাসটানা দিয়ে। গানের মাঝেমধ্যে হঠাৎ করেই নায়ক-নায়িকার ক্লোজশট উধাও হয়ে একজোড়া গোলাপের ঠোকাঠুকি দেখা যাবে।

মেরুন শেরোয়ানী পরা শিশুসুলভ হাসির রিয়াজকে ঘিরে একদল পাবলিক মজমা বসাবে, “পড়েনা চোখের পলক, টিং টিং, কী তোমার রূপের ঝলক, টিং টং”। ধনীগৃহ বোঝাতে যথারীতি হার্ডবোর্ডের ডুপ্লেক্স বাড়ীর সিঁড়ি দেখানো হবে। বহু খুঁজেও অবশ্য এই গানে “রূপের ঝলকের” ছিটেফোঁটাও দেখা যাবেনা ।

আচমকা মুক্তিযুদ্ধের গান “একনদী রক্ত পেরিয়ে” শুরু হলে বুঝতে হবে এইটাই শেষ গান, জোড়া উপস্থাপিকার খোমা-মোবারক শেষবারের মতো দেখার আগেই মশারি টাঙানো দরকার…

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: