গিরিশচন্দ্র সেনঃ পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআন- এর প্রথম বাংলা অনুবাদক

মূল লেখার লিংক

গিরিশচন্দ্র সেনঃ পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআন- এর প্রথম বাংলা অনুবাদক
গিরিশচন্দ্র সেন, ভাই গিরিশচন্দ্র সেন নামে তিনি অধিক পরিচিতি অর্জন করেছেন। তাঁর প্রধান পরিচয় ইসলাম ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআন- এর প্রথম বাংলা অনুবাদক হিসেবে। তখন প্রায় ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল যে, মূলভাষা থেকে অনূদিত হলে গ্রন্থটির পবিত্রতা ক্ষুন্ন হবে। পবিত্র কুরআন সম্পর্কেও এমন ধারণা ছিল। এ কারণে অনেক মুসলিম মনীষী এর বঙ্গানুবাদ করতে সাহস পাননি। তিনি অন্য ধর্মালম্বী হয়েও এই ভয়কে জয়ে পরিনত করেন। শুধু কুরআন শরীফের অনুবাদ নয় তিনি ইসলাম ধর্ম বিষয়ক অনেক গ্রন্থ অনুবাদ ও গবেষণা করেন।
মুক্তমনা ও অসাধারণ মানুষ গিরিশচন্দ্র সেনের জন্ম ১৮৩৪ সালে। বর্তমান নরসিংদী জেলার পাঁচদোনা গ্রামে এক বিখ্যাত দেওয়ান বৈদ্যবংশে। তাঁর বাবা মাধবরাম সেন। পিতামহ ছিলেন রামমোহন সেন। গিরিশচন্দ্ররা ছিলেন তিন ভাই। ঈশ্বরচন্দ্র সেন, হরচন্দ্র সেন এবং সর্বকনিষ্ঠ গিরিশচন্দ্র সেন। তৎকালীন সময়ে সেন পরিবার ছিল অত্যন্ত রক্ষণশীল। পরিবারে সনাতন ধর্মের আচরণ কঠোরভাবে মেনে চলা হতো। কুসংস্কারাচ্ছন্ন পরিবারে জন্ম নিয়েও গিরিশচন্দ্র সেন একজন সম্পূর্ণ সংস্কার মুক্ত মানুষ হয়েছিলেন।
পাড়াশুনার হাতেখড়ি পরিবারে। তারপর প্রাথমিক পড়াশুনা শেষ করে গিরিশচন্দ্র ঢাকার পোগোজ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। কিন্তু তিনি বেশিদিন বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে সক্ষম হননি। কারণ শিক্ষকদের পিটুনীর ভয়। এই ভয়ের জন্য তাঁর লেখাপড়ার ইতি ঘটে। তারপর তিনি পাঁচদোনায় নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। পাশের গ্রাম শানখোলায় কৃষ্ণ চন্দ্র রায় নামে একজন খুব ভালো ফারসি জানা লোকের কাছে গিরিশচন্দ্র ফারসি ভাষা শিখতে শুরু করেন। এরপর গিরিশচন্দ্র ময়মসিংহের ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট ও কাজী মৌলবী আব্দুল করিম সাহেবের কাছে রোক্কাতে আল্লামী অধ্যয়ন করেন।
১৮৭৬ সালের আরবি শিক্ষার জন্য গিরিশচন্দ্র লক্ষ্মৌ যান। সেখানে তিনি মৌলবী এহসান আলী সাহেবের কাছে আরবি ব্যাকরণ ও দিওয়ান-ই-হাফিজের পাঠ গ্রহণ করেন। তারপর তিনি কলকাতার একজন মৌলবীর কাছে এ বিষয়ে আরও কিছু শিক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর ঢাকায় নলগোলায় মৌলবী আলিমউদ্দিন সাহেবের কাছে আরবি ইতিহাস ও সাহিত্যের পাঠ গ্রহণ করেন।
বেশ কিছুদিন বেকার বসে থাকার পর ১৮৭৮ সালে তিনি ময়মনসিংহ জেলাস্কুলে সহকারী শিক্ষকের (দ্বিতীয় পন্ডিত) পদে যোগদান করেন। কিন্তু গিরিশচন্দ্র সামান্য এক চাকরির মাঝে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখতে পারলেন না। পুনরায় তিনি নিজে নিজেই সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চাও শুরু করলেন। তৎকালীন ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘ঢাকা প্রকাশ’ পত্রিকায় তিনি ময়মনসিংহের সংবাদদাতা ছিলেন।
কিছু দিন পর তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে গিরিশচন্দ্র কলকাতায় যান। সেখানে রাজা রামমোহন রায় প্রবর্তিত ব্রাহ্মধর্মের তৎকালীন প্রচারক কেশবচন্দ্র সেনের তাঁর সাথে দেখা হয়। তাঁরই প্রভাবে গিরিশচন্দ্র সেন ব্রাহ্ম মতবাদে দীক্ষা নেন।
কেশবচন্দ্রের অনুরো্ধে তিনি ফারসি ভাষায় আরো গভীর জ্ঞান লাভ এবং আরবি-ফারসি সাহিত্যের ওপর পড়াশোনা করার জন্য কানপুর ও লখনউ যান। ফিরে আসার পর কেশবচন্দ্রের উৎসাহেই তিনি ইসলামি দর্শনের উপর গবেষণা শুরু করেন। কিন্তু ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে পড়াশোনা ও গবেষণা করার জন্য প্রধান বাঁধাই ছিল ভাষা। হিন্দু ও খ্রিস্ট ধর্মের ধর্মগ্রন্থসমূহ অনেক আগেই বাংলায় অনূদিত হয়েছিল। কিন্তু ইসলাম ধর্মের কোন ধর্মশাস্ত্রই বাংলাভাষায় ছিলনা। বিশেষ করে কুরআন ও হাদিস তখনো বাংলায় প্রকাশিত হয়নি। যার ফলে কুরআনের মর্মার্থ অনুবাধন করা থেকে বৃহত্তর মুসলিম সমাজ পুরোপুরিই বঞ্চিত ছিল। তাই ব্রাহ্মসমাজের কেশবচন্দ্র সেন পরিচালিত নববিধান সভা ইসলাম ধর্মগ্রন্থসমূহ বাংলায় অনুবাদ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। স্বাভাবিকভাবেই, আরবি-ফারসি ভাষার সুপন্ডিত ভাই গিরিশচন্দ্র সেনকে অনুবাদের দায়িত্বপূর্ণ কাজ দেয়া হয়।

তিনি কুরআন শরীফের সম্পূর্ণ অংশ, মিশকাত শরীফের প্রায় অধিকাংশ, হাদিস, তাজকিরাতুল আউলিয়া, দিওয়ান-ই-হাফিজ, গুলিস্তাঁ, বুঁস্তা, মকতুব্বত-ই-মাকদুস, শারফ উদ্দিন মুনিবী, মসনভী-ই-রুমী, কিমিয়া-ই-সাদত, গুলশান-ই-আসরারসহ বহু ইসলামি গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করেন।
তাঁর প্রথমগ্রন্থ ব্রহ্মময়ী-চরিত(জীবনী) প্রকাশিত হয় ১৮৬৯ সালে। তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘হিতোপদেশমালা’-র গল্পগুলো ছিল কবি শেখ সাদির গুলিস্তাঁ গ্রন্থের কিছু গল্পের অনুবাদ। এটি প্রকাশিত হয় ১৮৭১ সালের ১৩ নভেম্বর ঢাকার গিরিশ প্রেস থেকে। ‘ধর্ম ও নীতি’ প্রকাশিত হয় ১৮৭৩ সালের ১৮ জুলাই কলকাতার ওল্ড ইন্ডিয়ান প্রেস থেকে। এরপর তিনি ‘আকসিরে হেদায়েত’ থেকে অনুবাদ করে প্রকাশ করেন ‘ধর্ম-বন্ধু’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৮৭৬ সালের ২০ আগস্ট কলকাতার বাহ্মসমাজ থেকে। তিনি তিন খণ্ডে পারস্যের কবি হাফিজের জীবনী, নৈতিক উপদেশ ও বাণীসমূহের অনুবাদ প্রকাশ করেন। এর প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৮৭৭ সালের ২৩ জানুয়ারি, দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৮৯০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি এবং তৃতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৮৯৮ সালের ১৮ অক্টোবর। ‘দরবেশদিগের উক্তি (তাসাউফ)’ শিরোনামের এই গ্রন্থটিও প্রকাশ কয় ব্রাহ্মসমাজ থেকে। উর্দুগ্রন্থ ‘আকসিরে হেদায়েত’ থেকে তিনি মুসলিম দরবেশগণের বাণী সঙ্কলন ও অনুবাদ করে প্রকাশ করেন। ‘নীতিমালা’ শিরোনামের এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৮৭৭ সালের ১৯ আগস্ট। ‘দরবেশদের ক্রিয়া’(তাসাউফ) প্রকাশিত ১৮৭৮ সালে এবং মুসলিম পীর-দরবেশরা কীভাবে আল্লাহ্‌র ইবাদত করার জন্য প্রস্তুত হন, নামাজ আদায় করেন ও কীভাবে তত্ত্বলাভ করেন, এ সম্পর্কিত আলোচনা বিষয়ক গ্রন্থের অনুবাদ ‘দরবেশদিগের সাধন প্রণালী’ প্রকাশিত হয় ১৮৭৯ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। কুরআনের বাছাই করা আয়াতের অনুবাদ ‘প্রবচনবলী (ধর্ম উপদেশ)’ প্রকাশিত হয় ব্রাহ্মসমাজ থেকে ১৮৮০ সালের ২০ জানুয়ারি।
ভাই গিরিশ্চন্দ্র সেনের মিশনারিসুলভ কাজের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল ‘তাজকিরাতুল আউলিয়া’-র বাংলা অনুবাদ ‘তাপসমালা’ শিরোনামে একটি ধারাবাহিক গ্রন্থের প্রকাশ। তাজকিরাতুল আউলিয়াতে মোট ৯৬ জন মুসলিম দরবেশের কাহিনী বর্ণিত আছে। এই কাহিনীগুলো ভাই গিরিশচন্দ্র সেন বাংলায় অনুবাদ করেন। তিনি মোট ছয় খন্ডে এই বিশাল অনুবাদ কর্মটি সম্পন্ন করেন।
অনুবাদক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করার পর তিনি কুরআনের অনুবাদের কাজ শুরু করেন। তিনি পর্যায়ক্রমে মোট ১২ টি খণ্ডে এই অনুবাদক্ররম সমাপ্ত করেন। ১৮৮১ সালের ১২ ডিসেম্বর কুরআনের প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়। প্রথম খণ্ড প্রকাশের সময় গিরিশচন্দ্র অনুবাদকের নাম গোপন রাখেন। কারণ তৎকালীন সময়ে কাজটি যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। মুসলিম সমাজে এর প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে সে সম্পর্কে তাঁর কোন ধারণাই ছিলনা। গ্রন্থটিতে শুধুমাত্র প্রকাশক গিরিশচন্দ্র সেন এবং মুদ্রক তারিণীচরণ বিশ্বাসের নাম ছিল। ৩২ পৃষ্ঠার এই খণ্ডের মূল্য ছিল মাত্র চারআনা। কিন্তু গিরিশচন্দ্রের আশংকা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হলো। মুসলমান আলেমসমাজ এই মহৎকর্ম সম্পাদন করার জন্য এই অজ্ঞাতনামা অনুবাদকের প্রশংসা করে ব্রাহ্মসমাজের নিকট পত্র প্রেরণ করেন। তাঁদের প্রশংসাপূর্ণ পত্রের অংশবিশেষ নিন্মে তুলে ধরা হলোঃ
“আমরা বিশ্বাস ও জাতিতে মুসলমান। আপনি নিঃস্বার্থভাবে জনহিত সাধনের জন্য যে এতোদৃশ চেষ্টা ও কষ্ট সহকারে আমাদিগের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআনের গভীর অর্থ প্রচারে সাধারণের উপকার সাধনে নিযুক্ত হইয়াছেন, এজন্য আমাদের আত্যুত্তম ও আন্তরিক বহু কৃতজ্ঞতা আপনার প্রতি দেয়”। কুরআনের সম্পূর্ণ খণ্ড একত্রে প্রকাশিত হয় ১৮৮৬ সালে। সম্পূর্ণ খণ্ড প্রথম তিনি স্বনামে আত্নপ্রকাশ করেন।
কুরআনের পর তাঁর আর একটি বড় কাজ হাদিসের অনুবাদ। হাদিসও কয়েক খণ্ড পর্যায়ক্রমে প্রকাশিত হয়। এর প্রথম খণ্ড হাদিস-পূর্ব-বিভাগ (১ম খণ্ড) প্রকাশিত হয় ১৮৯২ সালের ২৪ জানুয়ারি। শেষ খণ্ড হাদিস-উত্তর-বিভাগ (৪র্থ খণ্ড) প্রকাশিত হয় ১৯০৮ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর।
তাঁর জীবনী গ্রন্থমালা সমূহও মূলত ‘তাপসমালা’র সমতুল্য। ‘মহাপুরুষ চরিত’ প্রথম ভাগ প্রকাশিত হয় ১৮৮৩ সালে। প্রথম ভাগে ছিল হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও হযরত দাউদ (আ.)-এর জীবনী। দ্বিতীয় ভাগে ছিল হযরত মুসা (আ.)-এর জীবনী (১৮৮৪ সালের ৬ জানুয়ারি)। তৃতীয় ভাগে আছে ইহুদী রাজা কিং ডেভিডের জীবনী। তাঁর ‘জীবনচরিতমালা’-র আরেকটি বড় গ্রন্থ হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনী। এর প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৮৮৬ সালের ২৩ জানুয়ারি। দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৮৮৭ সালের ২৪ জানুয়ারি। তৃতীয় ও শেষ খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৮৮৭ সালের ২৮ মে।
ভাই গিরিশচন্দ্র সেন ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘সুলভ সমাচার’ নামের দুটি পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক ছিলেন। তৎকালীন পশ্চাৎপদ নারী সমাজের জাগরণে নিজউদ্যোগে প্রকাশ করেছিলেন ‘মহিলা’ নামের একটি পত্রিকা। তিনি নিজেই এর সম্পাদক ছিলেন।
ভাই গিরিশচন্দ্র সেন ১৯১০ সালের ১৫ আগস্ট মারা যান।

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: