তাজমহলঃ লুকানো সত্য?

georgis05_1278557282_1-Intro.jpg

শ্বাশত ভালবাসার অনন্য নিদর্শন- তাজমহল। মোঘল স্থাপত্যের এই অনন্যশৈলীর মাধ্যমে মানব হৃদয়ের ভালবাসার যে বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তা সত্যিই প্রশংশনীয়।
মনুষ্য সৃষ্ট পৃথিবীর সাতটি বিস্ময়ের একটি এ তাজমহল ভারতের উত্তর প্রদেশের আগ্রায়, যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত। এ বিস্ময়ের সৌন্দর্যের বর্ণনা যেকোন ভাষাতীত।

তাজমহলঃ পেছনের কাহিনী
তাজমহল তৈরি করেন মোঘল সম্রাট আকবরের দৌহিত্র সম্রাট শাহজাহান, তাঁর প্রিয়তম স্ত্রী আরজুমান্দ বানু বেগমের (মমতাজ মহল নামেই বেশি পরিচিত) স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে। মমতাজ মহল ছিলেন শাহজাহানের তৃতীয় স্ত্রী। মমতাজ মহল ১৬৩১ সালে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে বুরহানপরে ১৪তম সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান। স্ত্রী হারানোর শোকে মুহ্যমান শাহজাহান তাঁর প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর স্মৃতির জন্য নির্মাণ করেন ভালবাসার এই অপরূপ নিদর্শন।

georgis05_1278557541_2-Shahjahan.jpg
সম্রাট শাহজাহান

georgis05_1278557610_3-Mumtaz.jpg
মমতাজ মহল

তাজমহলের নির্মান শুরু হয় ১৬৩২ সালে; মমতাজের মৃত্যুর এক বছর পর। ২০ হাজারের বেশি শ্রমিকের প্রচেষ্টায় ১৬৪৮ সালে, মমতাজের মৃত্যুর ১৭ বছর পর গম্বুজ গুলোর নির্মান কাজ শেষ হয়; যদিও পুরো কাজ শেষ হয় ১৬৫৩ সালে। শুধু মানুষ নয়; এ মহান কীর্তির ভাগিদার ১০০০ হাতী, যারা নির্মাণের জন্য মার্বেল পাথর পরিবহনে নিয়োজিত ছিল।

georgis05_1278557828_4-18601.jpg
তাজমহল (১৮৬০ সালে তোলা)

স্থাপত্যশৈলী
পুরো তাজমহল ১৮০ ফুট উঁচু যার প্রধান গম্বুজটি ২১৩ ফুট উঁচু এবং ৬০ ফুট চওড়া এবং এর চারপাশে চারটি মিনার আছে যার প্রতিটির উচ্চতা ১৬২.৫ ফুট। পুরো কমপ্লেক্সটির আকার ১৯০২X১০০২ ফুট। শুধু তাজমহলটি ১৮৬X১৮৬ ফুট মার্বেল পাথরের উপর নির্মিত। এর প্রধান প্রবেশদ্বার ১৫১X১১৭ ফুট চওড়া এবং ১০০ ফুট উঁচু।
তাজমহল নির্মানের জন্য পাঞ্জাব থেকে আনা হয় স্বচ্ছ মার্বেল পাথর, চীন থেকে সবুজ পাথর, তিব্বত থেকে স্বচ্ছ ও নীল পাথর এবং শ্রীলংকা থেকে নীলমনি। তাছাড়া ভারত, পাকিস্তান, পারস্য ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ২৮ রকমের মূল্যবান পাথর দিয়ে তৈরি করা হয় এই অনন্য স্থাপত্য।
• তাজমহলের প্রধান ডিজিইনার হলেন ইরানের বিখ্যাত স্থপতি ওস্তাদ মুহাম্মদ আফেনদি।
• গম্বুজগুলো ডিজাইন করেন ইসমাইল আফেনদি
• লাহোরের কাজিম খান ছিলেন প্রধান স্বর্ণকারক
• দিল্লির চিরঞ্জীলাল হলের প্রধান ভাস্কর
• ইরানের আমানত খান হলেন খোদাই শিল্পী

georgis05_1278557971_5-Entrance11.jpg
তাজমহলের প্রধান প্রবেশদ্বার

georgis05_1278558294_7-Arches.jpg
তাজমহলের অভ্যন্তর

বিস্ময়কর গম্বুজঃ
তাজমহলের গম্বুজগুলো হল অন্যতম মনোমুগ্ধকর বস্তু।গম্বুজের সাদা মার্বেল গুলো সূযোর্দয়ের সময় গোলাপি আভা ছড়ায়। গোধুলিতে অপসৃয়মান সূর্যের বিভিন্ন রঙের আলো প্রতিফলন করে। আর রাতের বেলা পূর্ণিমার আলোয় গম্বুজগুলো যেন মুক্তোর মত চকচক করে। ভরা পূর্ণিমার ভালবাসার এ মহাস্থাপনা সোনালি আর নীল আলোয় লুকোচুরি খেলে। আর কুয়াশা মাখা দিনে ভালবাসার এ স্তম্ভ যেন মেঘের গায়ে ভেসে বেড়ায়। প্রচলিত আছে, গম্বুজগুলো থেকে যে রঙ-বেরঙের আলোর ছটা বিচ্ছুরিত হয় তা নারীর আবেগ ও অনুভুতিকেই প্রকাশ করে।

georgis05_1278558396_8-taj_behind_jamuna.jpg
যমুনার কোল ঘেঁষে….

georgis05_1278558494_9-taj_mahal.jpg
সূর্যাস্তের আলোয় রক্তিম তাজমহল

আরো কিছু তথ্যঃ
• মমতাজ মহল মারা যাওয়ার পর প্রথম তাঁকে সমাহিত করা হয় জয়নাবাদ বাগানে। ৬ মাস পর তাঁকে পুনরায় সমাহিত করা হয় আগ্রার তাজমহলে (তখনও তাজমহল নির্মিত হয়নি)।
• মমতাজ মহলের সমাধিস্থলে আল্লাহতায়ালার ৯৯ নাম খোদাই করা আছে।
• সম্রাট শাহজানের সমাধিতে খোদাই করা তাঁর মৃত্যু দিবস– ২৬ শে রজব দিবাগত রাত্রি, ১০৭৬ হিজরি।
• ইতিহাস বলছে তাজমহল তৈরিতে সম্রাট শাহজাহানকে সেই সময়ের হিসাবে ৪১১ লাখ ৪৮ হাজার ৮২৬ রুপী ৭ আনা ৬ পয়সা গুনতে হয়েছিল।
• ভারতবর্ষে এ গল্প এখনও প্রচলিত যে সম্রাট শাহজাহান তাজমহল নির্মানের পর নির্মান শ্রমিকদের হাতের কবজি কেটে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে ধরিত্রীতে দ্বিতীয় তাজমহল তৈরি না হয়।
• মমতাজ মহলের মৃত্যুর পর সম্রাট শাহজাহান দুই বছর শোক পালন করেন, বেশিরভাগ সময় রাজকর্ম বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ একা থাকতেন। এর পর তাঁর পুত্র আওরঙ্গজেব সিংহাসনে আরোহন করেন এবং শাহজাহানকে আগ্রার কেল্লায় বন্দী করেন। বন্দী অবস্থায় কেল্লা থেকেই তিনি তাজমহলের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন এবং বন্দী দশাতেই তাঁর মৃত্যু হয়। প্রিয়তমা মমতাজ মহলের সমাধির পাশেই তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
• যদি আপনার প্রিয়জনকে নিয়ে তাজমহল ভ্রমণ করতে চান তাহলে পূর্ণিমার রাতে তাজমহল দর্শন করতে ভুলবেন না। রাতের জোছনা মাখা তাজমহলের রূপ, সোনায় মোড়ানো গম্বুজ আর সবুজ চাদরের লনের তুলনা এ ধরিত্রীর কারো সাথে সম্ভব নয়।

georgis05_1278558587_10-Tombs111.jpg
এইখানেই ঘুমিয়ে আছেন সম্রাট শাহজাহান এবং তার প্রিয় “তাজ”

তাজমহলঃ লুকানো সত্য??
উপরে যা বললাম তা কমবেশি সবাই জানেন। কিন্তু এবার একটু নড়েচড়ে বসুন। কারন এখন যা বলতে যাচ্ছি তা হয়ত অনেকের কাছেই নতুন ও অন্যরকম মনে হতে পারে।

আমাদের চেনা-জানা তাজমহলের ইতিহাসকে চ্যালেঞ্জ করে বসেন প্রফেসর পি.এন. অক (Professor P.N. Oak– Taj Mahal: The True Story বই এর লেখক)। তিনি দাবী করেন যে তাজমহল বেগম মমতাজ মহলের সম্মানে নির্মিত প্রেমের সমাধিস্থল নয়; বরং এটা প্রাচীন দেবতা শিব (যাকে আগে বলা হত “তেজ মহালয়”) এর মন্দির যেখানে আগ্রার রাতপুতরা পূজা অর্চনা করত!! পরে শাহজাহান একে তাঁর মৃত স্ত্রীর স্মরণে স্মৃতিশালা হিসেবে গড়ে তোলেন।

ইতিহাস অনুসন্ধানে তিনি দেখতে পান যে শিব মন্দিরটি সম্রাট শাহজাহান অন্যায়ভাবে জয়পুরের মহারাজার (জয় সিং) কাছ থেকে দখল করেন। সম্রাট শাহজাহান তাঁর নিজস্ব দিনপঞ্জীতেও (বাদশাহনামা) উল্লেখ করেছেন যে, জয় সিং এর কাছ থেকে আগ্রার এক চমৎকার প্রাসাদোপম ভবন মমতাজ মহলের সমাধিস্থলের জন্য বেছে নেয়া হয়। এবং এর জন্য জয় সিংকে অনত্র জমিও দেয়া হয় সম্রাট শাহজাহানের পক্ষ থেকে।

“তাজমহল” নাম নিয়েও প্রফেসর অক সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, মোগল আমল (এমনকি সম্রাট শাহজাহানের আমলেও) দলিলাদি ও কোর্টের নথিপত্রে কোথাও “তাজমহল” নাম উল্লেখ নাই! তাছাড়া ওই সময়ে কোন মুসলিম দেশে কোন প্রাসাদ/ভবনের নাম “মহল” রাখার প্রচলন ছিল না!
তাজমহল নাম এসেছে মমতাজ মহল থেকে—এটাও তাঁর কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি দুইটি কারনে। প্রথমতঃ তাঁর প্রকৃত নাম কখনই মমতাজ মহল ছিল না। দ্বিতীয়তঃ কেউ কারো নামে কোন প্রাসাদের নামকরন করতে চাইলে তার নামের প্রথম দুই অক্ষর বাদ দিয়ে (মমতাজ থেকে “মম” বাদ দিয়ে তাজ) নাম রাখবেন–এটাও সহজে মেনে নেয়া যায়না।

তিনি আরো বলেন, মমতাজ আর শাহজাহানের ভালবাসার গল্প মুলতঃ রূপকথা যা ওই সময়ের লোকদের মুখ থেকে সৃষ্ট; কারন ওই সময়কার কোন সরকারী নথিপত্রে বা গ্রন্থে মমতাজ-শাহজাহানের প্রেমের কথা উল্লেখ নাই।

পাশাপশি প্রফেসর অক কিছু ডকুমেন্ট উপস্থাপন করেন যা প্রমাণ করে তাজমহল শাহজাহান শাসনামলের নয়!-
১। নিউ ইয়র্কের আর্কিওলজিস্ট মারভিন মিলার (Marvin Miller) যমুনা নদীর তীর সংলগ্ন তাজমহলের দেয়ালের নমুনা পরীক্ষা করে তাতে যে কার্বন পাওয়া যায় তা সম্রাট শাহজাহনের শাসনামলেরও ৩০০ বছরের পুরনো!
২। ইউরোপিয়ান পর্যটক যিনি ১৬৩৮ সালে আগ্রা ভ্রমন করেন (মমতাজ মারা যাওয়ার মাত্র সাত বছর পর) তিনি তার গ্রন্থে সেসময় তাজমহল তৈরির কোন সূত্র উল্লেক করেননি।

প্রফেসর অক তাজমহলের স্থাপত্যশৈলীর কিছু অসামঞ্জস্যতার কথা তুলে ধরে বলেন যে তাজমহল মুলতঃ হিন্দু মন্দির ছাড়া আর কিছুই নয়।
তিনি বলেন তাজমহলের অনেক কামরাই শাহজাহানের আমল থেকেই তালবদ্ধ করে রাখা হয়েছে যা এখনও জনসাধারনের অজানা রয়ে গেছে। প্রফেসর অক দৃঢ়তার সাথে দাবী করেন যে ওই কামরাগুলোর একটাতেই আছে দেবতা শিবের মস্তকবিহীন মূর্তি যা সচরাচর হিন্দুদের মন্দিরে দেখা যায়।

ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক সংঘাতের আশংকায় ইন্দিরা গান্ধির সরকার প্রফেসর অকের বই বাজার থেকে উঠিয়ে নেয় এবং ভারতে এর প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়।

…থাকুক কিছু রহস্য, রহস্য আছে বলেই তাজ হয়ত আজ এত সুন্দর…!!

মূল লেখার লিংক
http://www.somewhereinblog.net/blog/georgis05/29194697

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: