নোবেল প্রাইজ

প্রায় বছর পাঁচেক আগের কথা। অন্যান্য দিনের মত সেদিনও সন্ধ্যেবেলা অফিস থেকে ফিরে বাড়ির দরজায় বেল বাজিয়েছি। সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসা হাওয়াই চপ্পলের চটর-পটর ধ্বনি শুনেই মনে হল বৌ যেন আজ খুশীতে ডগমগ হয়ে নামছে। জুতোর ফিতে খুলতে খুলতে শুনলাম, ‘জানো তো আজ দিয়া, … না থাক তুমি বরং ফ্রেশ হয়ে নাও। চা খেতে খেতে বলব।’

দিয়া, মানে আমার মেয়ে। বছর তিনেক বয়স। কিছুদিন হল প্লে-স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। রোজ তার নতুন নতুন খবর থাকে। কোনদিন নতুন একটা ছড়া শিখে এল, কোনদিন বা কাকে আঁচড়ে-কামড়ে দিয়ে এল। আজকেরটা মনে হয়ে বেশ ভালোর দিকেই। কি হতে পারে ভাবতে ভাবতে চানের ঘরে ঢুকলাম।

আমাদের শোয়ার ঘর আর চানের ঘর ওপরে। সিঁড়ি দিয়ে খাবার টেবিলের দিকে যেতে যেতে দেখলাম, রান্নাঘরে গিন্নী চায়ের কাপে টুং-টাং করছে। ওখান থেকেই গল্পের ভূমিকা শুরু হল, ‘আজ দুপুরে দিয়াকে গল্প বলছিলাম।’

এই হয়েছে এক ঝামেলা। রোজ মেয়ের খাওয়ার সময় গল্প শোনা চাই। দুপুরে মায়ের পালা, রাতে আমার। কোন গল্প পুরো বলতে সে পারে না, কিন্তু এক গল্প দু-বার বললেই ধরে ফেলবে, ‘তারপর তো এটা হল, তাই না?’ মেয়ের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য পুরাণ-কাহিনী দিয়ে শুরু করেছিলাম। স্টক প্রায় খতম। এবার মহাভারত ধরব ভাবছি। নাহয় একটা পুরো কাশিদাসী কিনেই ফেলব। বৌ টুকটাক গল্পের বই কিনতে শুরু করেছে।

‘কি বলি, কি বলি। শেষকালে ঈশপের গল্প বলা শুরু করলাম। ঐ যে ওটাগো, ঐ যে কাক আর কলসীর গল্প। যেখানে কাকের খুব তেষ্টা পেয়েছিল। কিন্তু দেখল কলসীর জল অনেক নীচে। তাই সে রাস্তা থেকে পেবলস তুলে নিয়ে কলসীতে ফেলতে লাগল।’

ইংরিজী মিডিয়াম বৌ হলে এই মুশকিল। ঢিল বলতে পারবে না, পাথরের টুকরোও বলবে না – একদম পেবলস। যাক ভুলভাল মন্তব্য করে গল্পটা এখানে মাঠে মেরে দিলে কেলো হয়ে যাবে। আমি চুপচাপ চায়ের কাপে চুমুক দিতে থাকলাম।

– গল্প শেষ করে যেই বলতে যাব, কাকের কি বুদ্ধি দেখেছিস?

মেয়ে আমার বলে কি জান? ‘মা, কাকটা এত বোকা কেন?’
আমি বললাম, ‘কেন? বোকামি কি করল?’
– কাকটা পেবলস না কুড়িয়ে একটা স্ট্র যোগাড় করলেই তো পারতো।

‘চিন্তা কর। আমরা সেই কবে ছোটবেলা থেকে কাকের বুদ্ধির গল্প শুনে এসেছি। এই বুড়ো বয়সে এসেও (ব্যাপার কঠিন দিকে এগোচ্ছে – গিন্নীর কথা অস্বীকার করলেও মুশকিল, আবার বুড়ো বয়স স্বীকার করাও রিস্কি। আমি খুব সাবধানে শুনতে লাগলাম।) কাকটাকে বোকা মনে হয়নি। মেয়ে আমার এক কথায় কাককে বোকা বানিয়ে দিল।’

আমরা দুজনেই আলোচনার মাধ্যমে মেনে নিলাম, মেয়ে শুধু কাককেই বোকা বলেনি, প্রকারান্তরে ঈশপ থেকে তার বাবা-মা (মানে আমরা) পর্‍্যন্ত সমস্ত মানবজাতির নির্বুদ্ধিতাকেই সে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। মেয়ে যে আমাদের ভীষণ বুদ্ধিমতী, তার লেখাপড়ার দিকে যে আমাদের প্রচুর পরিমাণে নজর দেওয়া দরকার, সে ব্যাপারে আমরা দুজনেই একমত হলাম। তাকে ডাক্তার-ইঞ্জিনীয়ার বানাব, না ম্যানেজমেন্ট গুরু, নাকি আইটিতেই পাঠাব, এই নিয়ে গবেষণা করতে করতে সে রাতে আমরা ঘুমোতে গেলাম।

ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখলাম, মেয়ে আমার নোবেল প্রাইজ পেয়েছে। প্রচুর লোকজন বাড়িতে এসে তাকে সম্বর্ধনা দিচ্ছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। সকালে চায়ের টেবিলে বসে প্রথমেই সোফাটার দিকে নজর গেল। কয়েক বছর আগে বিয়েতে পাওয়া। একটু পুরনো হয়ে গেছে। কাল রাতে স্বপ্নে অত সব ঝকঝকে লোকদের মধ্যে সোফাটা কেমন বেমানান লাগছিল (হলই না হয় স্বপ্ন), বোনাসটা পেলে বদলাতে হবে। ভোরের স্বপ্ন মিথ্যে হবে না নিশ্চয়ই।

তাড়াতাড়ি নাশতা করেই অফিসের দিকে দৌড় লাগিয়েছি। বিশ বছর পরে মেয়ে নোবেল প্রাইজ পাচ্ছে, সবাইকে জানাতে হবে না? কিন্তু তাড়াতাড়ি করলে কি হবে? তাদের মেয়েরাতো আর নোবেল প্রাইজ পাচ্ছে না। অফিসে পৌঁছে দেখি, ফাঁকা হলঘর। কোনায় কোনায় একটা-দুটো লাইট জ্বলছে। আমি লগ-ইন করে মেল চেক করতে লাগলাম। সাড়ে-দশটা নাগাদ অর্ণব এসে হাঁক পাড়ল, ‘শঙ্করদা, চা খেতে যাবেন না?’

যাবো না মানে!!! এই মুহূর্তটার জন্যে তখন থেকে মুখিয়ে আছি। বিশ-বছর পরের নোবেল-লরিয়েটের বাপ আমি। হুঁ হুঁ বাব্বা।

ক্যান্টিনে গিয়ে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে জমিয়ে গল্পটা শুরু করেছি। যেইনা, মেয়ের কমেন্ট বলেছি, পরাগ বলে, ‘স্ট্র নিয়ে আসার কথা তো? আমার মেয়েও ওই একই কথা বলেছে।’ ওর মেয়েও আমার মেয়ের বয়সী।

তারপর ওরা আজকালকার ছেলেমেয়েদের কি ভীষণ এক্সপোজার বেড়েছে, জেনারেশন গ্যাপ এইসব নিয়ে আলোচনা চালাতে লাগলো। আর আমি মেয়ের নোবেল প্রাইজটা ফস্কে যাওয়ার দুঃখে মনমরা হয়ে বসে রইলাম।

সোফাটা আর বদলাতে হবে না।

http://www.sachalayatan.com/shankar/35080

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: