‘আমেরিকার সবচেয়ে বুদ্ধিমান লোক’

বুদ্ধিমত্তার ধরণ নিয়ে ভাল একখানা বই পড়ার শখ আমার অনেকদিনের। শুধুই বুদ্ধিমত্তা নিয়ে লেখা বই এখনো যদিও সেভাবে পাইনি, এমন বই লেখা সম্ভব কিনা সেটাও জানি না। বুদ্ধিমত্তার সংজ্ঞা নিয়েই অজস্র বিবাদ আছে, এ কারণে বুদ্ধিমত্তাকে কত ভাগেই না ভাগ করা হয়; ড্যানিয়েল পিংক-এর ‘হাউ রাইট ব্রেইনার্স উইল রুল দ্য ওয়ার্ল্ড’ থেকে শুরু করে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সে’ এর উপর আইবিএ লাইব্রেরিতে গাবদা গাবদা বইগুলির কথা মনে পড়ছে। হাসি

বুদ্ধিমত্তা ধারণাটিকে এখনো হয়তো ক্রিস্টালাইজ করা যায়নি, তবে ইন্টেলিজেন্স কোয়োটিয়েন্ট, বা আইকিউকে বুদ্ধিমত্তার একটি প্রাত্যহিক জীবনে চলনসই পরিমাপক হিসেবে অনেকেই মেনে নিয়েছেন; অনেকটা বাধ্য হয়েই আরকি। আইকিউ মাপারও পদ্ধতির কোন অভাব নেই; ‘সাধারণ মানুষের’ জন্য এক স্কেল তো ‘গিফটেড মানুষের’ জন্য আরেক স্কেল (নাহলে বোঝা যায় না তারা কত বুদ্ধিমান, সিরিয়াসলি! হাসি )।

ক্রিস্টোফার ল্যাংগানকে কিছুদিন আগে একজন মহিলা পার করে গেছে ‘আমেরিকার সবচেয়ে বুদ্ধিমান ব্যক্তি’ হিসেবে আরেকটি নতুন স্কেলের কল্যানে, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ল্যাংগানই ছিলেন ‘আমেরিকার সবচেয়ে বুদ্ধিমান লোক’। এমনই বুদ্ধিমান ছিলেন ল্যাংগান, যে আইকিউ-এর হাই-ইন্টেলিজেন্স স্কেলেও তার স্কোর ছিল রীতিমত ‘অফ দ্য চার্ট’। হাসি

কিন্তু ল্যাংগানের গল্প বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আমাদের আরো কিছু প্রশ্নেরও উত্তর দেয়। আসেন তাহলে মূল গল্পে যাই।

একজন গড়, সাধারণ মানুষের আইকিউ ১০০।

আইনস্টাইনের আইকিউ ছিল ১৫০।

ক্রিস্টোফার ল্যাংগানের আইকিউ ১৯৫ (পুরোপুরি এক্যুরেট নয় যদিও, এর চেয়েও বেশি ধরা হয়)।

এই বিশাল আইকিউ এর জন্য ল্যাংগান অত্যন্ত জনপ্রিয়। নিউজউইক থেকে শুরু করে আমেরিকার জনপ্রিয় ম্যাগাজিনগুলো তাকে নিয়ে বিশাল সব প্রোফাইল বানিয়েছে, অজস্র টিভি শোতে তাকে আনা হয়েছে (কিছু টিভি শোতে, যেমন হু ওয়ান্টস টু বি আ মিলিওনিয়ার-এ, তাকে আবার ইচ্ছা করে আনাও হয় নি চোখ টিপি )। এমনকি, এরল মরিস ল্যাংগানকে নিয়ে ডকুমেন্টারিও বানিয়ে ছেড়েছেন!

একদিক দিয়ে দেখলে এ খ্যাতি বটে, আবার আরেক দিক দিয়ে দেখলে একটু চিড়িয়াখানা চিড়িয়াখানা গন্ধও কি পাওয়া যায় না? নিচের মত গ্রাফের জন্যই বোধ করি:

ল্যাংগানের আইকিউ স্কোর নিয়ে আরেকটু পরিষ্কার করি। আইকিউ স্কোর সাধারণত একটা স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশন ধরে প্রস্তুত করা হয়, নাহলে হাজার হাজার প্রশ্ন লাগতো। এ কারণে ল্যাংগানের মত আল্ট্রা-ইন্টেলিজেন্ট লোকজন, যারা একেবারে শুন্য দশমিক শুন্য শুন্য শুন্য এক ভাগ, তারা এসব পরীক্ষার দেয়ার উপযুক্ত নন। হাসি মানে, একবার যখন দেখা যায় তারা সর্বোচ্চ স্কোর করে ফেলেছেন ওসব পরীক্ষায়, পরের পরীক্ষার পাঠিয়ে দেয়া হয়, কারণ ওই পরীক্ষায় আর মাপা সম্ভব না।

তাদের জন্য বিশেষ পরীক্ষার বন্দোবস্ত করতে হয়, এবং এগুলো পয়সার ব্যাপার। কিন্তু অভিজ্ঞ নিউরোসাইকোলজিস্টদের দিয়ে এসব পরীক্ষা করাতে হয়, বিধায় খরচও পড়ে বেশি; এ কারণে ল্যাংগান বেশ বুড়ো বয়সে জানতে পেরেছেন যে তিনি এত এত বুদ্ধিমান (আগে কিছু প্রমান ছিল, যেমন ল্যাংগান ছয় মাস বয়সেই কথা বলা শুরু করেছিলেন, তিন বছরে বয়সে রেডিওতে কমিক্স শুনে শুনে একা একাই পড়তে শিখে গিয়েছিলেন; পাঁচ বছর বয়সে তার দাদাকে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে ল্যাংগান কুপোকাত করে ফেলেন)! তারপরও, এই নিউরোসাইকোলজিস্ট সাহেবের পরীক্ষায়ও দেখা গেল যে যত কঠিন কঠিন প্রশ্ন করা হয়েছে, তার সবই ল্যাংগান পেরে গেলেন। এর অর্থ হল, এমনকি এই পরীক্ষাও ল্যাংগানের বুদ্ধিমত্তা ‘বটলনেক করতে’ ব্যর্থ হয়েছে।

চুড়ান্তভাবে বিশেষ ব্যবস্থায় অত্যন্ত বুদ্ধিমান লোকদের জন্য একটি বিশেষ পরীক্ষার বন্দোবস্ত করা হয় (এই সুপার আইকিউ টেস্টটির সৃষ্টিকর্তা রোনাল্ড কে হফলিন, যার নিজের আইকিউ-ও ছিল অত্যন্ত উঁচু। একটা স্যাম্পল প্রশ্ন এখানে দেই: ‘ভারবাল এনালজি’ অংশ থেকে: “Teeth is to Hen as Nest is to ?” বলেন তো কি হবে উত্তর? চোখ টিপি )। সেখানের অত্যন্ত কঠিন সব প্রশ্নের মধ্যেও ল্যাংগান একটি বাদে সবগুলোর উত্তর পটাপট দিয়ে দিয়েছেন। সেখানে থেকেই এসেছে এই ১৯৫।

ল্যাংগানের লেখাপড়া নিয়ে আর কি বলবো? এই একটা গল্পই মনে হয় যথেষ্ট: স্কুলের থাকার সময় ‘বিদেশী ভাষা ক্লাসে’ ল্যাংগান হয়তো কিছু না পড়েই ঢুকে পড়লেন, হয়তো শিক্ষক আসতে দুই থেকে তিন মিনিট বাকি,তিনি এই দু-তিন মিনিটেই পড়াশোনা করে পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়ে বসে থাকতেন।

এইসব পড়লে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। এসএসসি পরীক্ষার প্রি-টেস্টে (না টেস্টে, ১০০% মনে নাই) এরকম একটা ঘটনা দেখসিলাম। দেখি আমাদের ক্লাসের সেকেন্ড বয় চল্লিশ মিনিটের পর অংক পরীক্ষায় আর কিছু ল্যাখে না (দুই ঘন্টার পরীক্ষা)। ওর পরীক্ষা শেষ।

এদিকে আমি আদ্ধেকও কুলায় উঠতে পারি নাই ততক্ষণে। ওই সময় আবার জ্বরও ছিল! মন খারাপ

এই একই অবস্থা বন্ধু জাহিদের সাথে জিম্যাট প্র্যাকটিস করতে গিয়ে (একবার শুরু করসিলাম আরকি, এখন আর করা হচ্ছে না; দেখি, পরে করার ইচ্ছা আছে)। অংক পার্টে সময় ৪৫ মিনিট, আমি আর ও পাশাপাশি পরীক্ষা দিচ্ছি; ও দেখি ৩০ মিনিটের পর আর নড়ে না চড়ে না। আমার এমনিতেই কঠিন অবস্থা, তা-ও পরীক্ষা ফালায় ব্যাপক টেনশন নিয়া বললাম, আদর্শ হোস্টের মত:

“কি হইসে রে দোস্ত?”

ও বলে:

“শেষ”।

দেখো দেখি! এই ধরণের ঘটনা চেষ্টা বনাম বুদ্ধির বিষয়ে একটা প্রশ্ন নিয়ে আসে।

আরো কিছু শোনেন তাহলে, ল্যাংগান স্যাট পরীক্ষা দিতে গিয়ে চরম বোরড হয়ে আসলে ঘুমিয়েই পড়েছিলেন, তারপরও পারফেক্ট স্কোর। ১০-১২ বছরের দিকে ল্যাংগান তার পরিবারের কৃষিক্ষেতে কাজ করতেন। এসময় জমির কাজের পাশাপাশি তিনি থিওরেটিকাল পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে বড় আকারে পড়াশোনা শুরু করেন। ষোল বছর বয়সে তিনি রাসেল আর আলফ্রেড নর্থ হোয়াইটহেডের জটিল ‘প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা’ পড়ে শেষ করেন।

ক্রিস ল্যাংগানের ভাই মার্কের মতে: “সে অংক করতো ধরেন এক ঘন্টা। তারপর ফ্রেঞ্চ পড়তো এক ঘন্টা। তারপর পড়তো রাশিয়ান। তারপর দর্শন। একেবারে রুটিন করে সে এই কাজ করতো।”

ল্যাংগানের আরেক ভাই জেফ-এর মতে, “জানেন কিনা, ক্রিস-এর বয়স যখন ১৪ বা ১৫ ছিল, সে স্রেফ মজা করার জন্য নানা রকম ছবি আঁকতো, সেগুলো একেবারে যাকে বলে ফটো-রিয়েলিস্টিক হতো। তারপর যখন ওর বয়স পনেরো হল, আমার ভাই জিমি হেনড্রিক্স-কে একেবারে হুবহু অনুকরন করে গিটার বাজাতে পারতো, বুম বুম বুম! অর্ধেক সময় ক্রিস স্কুলেই যেতো না! সে খালি গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে আসতো। স্কুল এই ব্যাপারে কিছু করতে পারতো না, কারণ ক্রিস বরাবরই শীর্ষ ছাত্র ছিল।

আমাদের জন্য আসলে ব্যাপারটা ছিল অত্যন্ত হাস্যকর। সে পুরো সেমিস্টারের টেক্সটবুক দুই দিনে শেষ করে সবাইকে ব্রিফ করতে পারতো, তারপর তার নিজের কাজ করতো, এই ধরেন জমি দেখা বা গরু চড়ানো, তারপর তার নিজের যা শখ একেবারে পুরোই পূরন করতে পারতো।”

তাহলে, এরকম তীব্রভাবে প্রখর ল্যাংগানের নাম আমরা এত কম শুনি কেন? এখন কি-ই বা করেন ল্যাংগান? বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ বিষয়ে ল্যাংগান আমাদের কি শেখাতে পারেন?

পরের পর্বে সে আলোচনা আমরা চালাবো।

মূল লেখার লিংক

http://www.sachalayatan.com/sirat/33174

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: