আমেরিকার সবচেয়ে বুদ্ধিমান লোক ২: ‘টারমাইট’

বর্তমানে পৃথিবীব্যাপী যে স্ট্যান্ডার্ডাইজড আইকিউ টেস্টটি ব্যবহার করা হয়, সেটির জনক কে, জানেন কি? হাসি

লুইস টারম্যান, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিষয়ক অধ্যাপক।

স্ট্যানফোর্ডের বিশাল ক্যাম্পাসের একপাশে স্থানীয়দের জন্য একটা স্কুল ছিল (আমরা ১৯২০ এর দিকের কথা বলছি); সেখানে বাথরুম পরিষ্কার করতো একটা ছেলে (এদের মার্কিনরা ‘জ্যানিটর’ বলে); ছেলেটার নাম হেনরি কাওয়েল।

কঠোর দারিদ্র্যে জন্ম তার। বাবা-মা-র মার-টার খেয়েই হয়তো, বা অন্য কি কারণে কে জানে, খুব বেশি মানুষজনের সাথে মিশতে পারতো না এই কাওয়েল। পরিবারও তেমন পাত্তা দিতো না বোঝাই যায়। সাত বছর বয়সে যখন এই ছেলে স্কুলে যাওয়া ছেড়ে দিল, তখন তাকে বিদ্যার্জনে ফেরৎ পাঠানোর কেউ ছিল না।

তো যাই হোক, টারম্যানের মাঝে মধ্যেই মনে হয় কাজ পড়তো ওদিকে। হঠাৎ হঠাৎ অসময়ে স্কুলটিতে এসে টারম্যান দেখতেন এই কাওয়েল ছোকড়া মনের সুখে পিয়ানো বাজাচ্ছে। দু’একবার ধরা খেয়ে কাঁচুমাঁচু মুখে সেই জ্যানিটর পিয়ানো ছেড়ে দৌড়ে পালালো। এরপর টারম্যান সন্তপর্ণে আসতেন, আড়ালে দাঁড়িয়ে কেবল গান শুনতেন।

খুব অসাধারণ পিয়ানো বাজাতো এই কাওয়েল; একেবারে যাকে বলে মন জুড়িয়ে দেয়া গান!

স্ট্যানফোর্ডে মনোবিজ্ঞান অধ্যাপক হিসেবে টারম্যানের বিশেষত্ব ছিল ‘বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষণ’। আগেই বলেছি, লাখ লাখ লোক যে ‘সাধারণ’ আইকিউ পরীক্ষা দেয়, যেটির নাম স্ট্যানফোর্ড-বিনে টেস্ট, সেটি এই লুইস টারম্যানেরই সৃষ্টি।

তো, টারম্যান ভাবলেন, এই ছোকড়ার আইকিউ পরীক্ষা করিই না কেন? এত অসাধারণ যে পিয়ানো বাজায়, সে কিরকম বুদ্ধিমান? টারম্যানের ধারণা ছিল, ভালই বুদ্ধিমান হওয়ার কথা; পিয়ানো বাজানো কঠিন কাজ কিন্তু!

ফলাফল আসলো ১৪০। স্ট্যানফোর্ড-বিনে স্কেলে ১৪০ হল যাকে বলে ‘প্রায়-জিনিয়াস পর্যায়ের আইকিউ’।

টারম্যান একদিক দিয়ে খুব খুশি হলেও, আরেক দিক দিয়ে বেশ মুষড়ে পড়লেন। দেখো, এই ক্যালিফোর্নিয়ার গহীন মরুতে এক স্কুলঘরের বাথরুম পরিষ্কার করে বেড়াচ্ছে এক ১৪০ আইকিউ-এর ছেলে! এরকম কত জিনিয়াসই না ফালানি যাচ্ছে। এই বুদ্ধির অপচয় প্রতিরোধ করা কতই না দরকার। মানবসভ্যতা না হলে তো আর যেই গতিতে আগানোর কথা তার ধারে কাছে গতিতেও আগাবে না!

টারম্যান জানতেন না কি করবেন। তিনি বুদ্ধি-বিবেচনা করতে লাগলেন এই জিনিয়াসদের অপচয় সমস্যাটিকে। এই পরিকল্পনার সময় তিনি কাওয়েল ধরনের আরো কিছু ‘অপচয়িত জিনিয়াস’ আবিষ্কার করলেন।

তিনি একটি মেয়েকে খুঁজে পেলেন, যে উনিশ মাস বয়সে সমগ্র ইংরেজি বর্ণমালা পুরোপুরি রপ্ত করেছিল; আরেকটা মেয়ে পেলেন, চার বছর বয়সেই সে ডিকেন্স আর শেক্সপিয়ার মনের আনন্দে শেষ করছিল।

আরেকটা ছেলেকে পেলেন, যাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করা দেয়া হয়েছে; অজুহাত? “অধ্যাপকরা বিশ্বাস করেননি যে কোন মানুষের পক্ষে বিশাল বিশাল আইনের বই একেবারেই না দেখে হুবহু মুখস্থ বলা সম্ভব; এই ছেলে নিশ্চয়ই অন্যায় কিছু করেছে!”

এসব দেখে টারম্যান আরো দুঃখ পেলেন। তিনি ভাবলেন, নাহ, আমি আমার জীবন নিয়োগ করবো এই কাজে। আমরা মানুষরা বুদ্ধিমত্তার অপটিমাল ব্যবহার থেকে অনেক দূরে আছি; আমি যদি সেদিকে সভ্যতাকে কিছুটা হলেও আগিয়ে দিতে পারি, আমি সার্থক।

যেই কথা, সেই কাজ।

১৯২১ সালে কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশন থেকে বিশালাকারের একটা মঞ্জুরি নিয়ে তিনি বেশ বড়সড় একটা দল দাঁড়া করিয়ে তাদের ক্যালিফোর্নিয়ার সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠালেন। শিক্ষকদের বলা হল ক্লাসের সবচেয়ে বুদ্ধিমান ছেলেমেয়েদের মনোনীত করতে।

এই বাচ্চাগুলোকে আইকিউ পরীক্ষা দেয়ানো হল (বাচ্চাদের জন্য পরিবর্তিতভাবে)। প্রথম পরীক্ষায় যারা সেরা দশ পার্সেন্টে ছিল, তাদের আরেকটা পরীক্ষা দেয়ানো হল। তারপর যারা এই দ্বিতীয় পরীক্ষায় ১৩০-এর বেশি স্কোর করলো, তাদের তৃতীয় আরেকটা পরীক্ষা দেয়ানো হল।

এরকম চিরুনী অভিযানের মাধ্যম টারম্যান একেবারে ক্যালিফোর্নিয়ার সেরা পোলাপানকে বের করে আনার পরিকল্পনা করলেন।

প্রথম পরীক্ষাটি দিয়েছিল প্রায় ২৫০,০০০ শিশু (ভাবেন স্কেল কাকে বলে!)।

একেবারে সব পরীক্ষা শেষে যাচাই বাছাইয়ের পর রইলো বাকি ১৪৭০ জন শিশু।

এই ১৪৭০ জনের সর্বনিম্ন আইকিউ ১৪০, আর সর্বোচ্চ মাপার বাইরে, ২০০-রও বেশি!

এই ১৪৭০ জন শিশু জিনিয়াসকে বাকি মনোবিজ্ঞানী এবং সাধারণ মানুষ, এমনকি পত্র পত্রিকাও মজা করে ডাকতো ‘টারমাইটস’। হাসি

তাঁর বাকি জীবন ধরে টারম্যান এই টারমাইটসদের অনুসরণ করে গেছেন। যাকে বলে ‘ট্র্যাকড এ্যান্ড টেস্টেড, মেজারড এ্যান্ড এ্যানালাইজড’; বুদ্ধিমত্তা সংক্রান্ত এদের কোন কিছুই টারম্যান বাদ দেননি। লেখাপড়া, বিয়ে, অসুস্থতা, মানসিক স্বাস্থ্য, কাজ, কাজে প্রমোশন, কাজ পাল্টানো – সবকিছু একদম চূড়ান্ত বিস্তারিতভাবে নোট করে রাখা হয়েছিল।

শুধু তাই না, টারম্যানও তার চিহ্নিত ছেলেপিলেকে সাহায্য করেছেন। লেটারস অফ রিকমেন্ডেশন থেকে শুরু করে গ্র্যাজুয়েট স্কুল এ্যাপ্লিকেশন, সব জায়গাতেই; উপদেশ ইত্যাদি তো বাদই দিলাম। এবং এই পুরো সময়টা জুড়েই টারম্যান এই সব রেকর্ড লিপিবদ্ধ করে গেছেন লাল বাঁধাই করা ইয়া মোটা সব ভলিউমে; নাম ‘জেনেটিক স্টাডিজ অফ জিনিয়াস’।

“একজন মানুষের জন্য তার আইকিউ-এর থেকে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নেই”, টারম্যান বলতেন, “উঁচু-আইকিউবিশিষ্ট মানুষের থেকেই আমরা আশা করতে পারি সেরকম নেতৃত্ব উৎপাদনে, যারা এগিয়ে নিয়ে যাবে বিজ্ঞান, কলা, সরকারব্যবস্থা, শিক্ষা এবং সামাজিক কল্যান।”

টারমাইটরা বড় হওয়ার সময় ব্যাপক আনন্দের সাথে টারম্যান লিখেছিলেন:

“আসলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এমন কোন প্রতিযোগিতাই হয় না, অন্তত যেখানে ক্যালিফোর্নিয়ার ছেলেপিলে অংশগ্রহণ করেছে, আর আমার তালিকায় জেতাদের বেশিরভাগের নাম নেই।”

টারম্যান এমনকি তার গ্রুপটিকে নিয়ে এমনই আশাবাদী ছিলেন যে এদের মধ্যে যারা লেখালেখি করতো, তাদের লেখা তিনি সাহিত্য সমালোচকদের দিয়ে বিখ্যাত লেখকদের প্রাথমিক লেখাগুলোর সাথে তুলনা করাতেন! সাহিত্য সমালোচকরাও কোন পার্থক্য পেতো না! টারম্যানের উত্তেজনা দেখে কে; তার হাতে এমন একদল ছেলেপিলে আছে, যারা তার ভাষায়, ‘হিরোইক স্ট্যাচার’-এর। তিনি মোটামুটি নিশ্চিত ছিলেন যে তার টারমাইটরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ এলিট হবে সব ক্ষেত্রেই।

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: