গ্যালিলিও ফিসফিস করে বললেন, ম্যারাডোনা কিংবা জিদান

বামনদের কারাগারে ফুটবলের সুপার ম্যান

ফুটবল মাঠ থেকে ম্যারাডোনার ডোপিং অপরাধে বেরিয়ে যাওয়া কিংবা জিদানের মাতারাতসিকে মেরে বেরিয়ে যাওয়া এই দুই পরাজিত মেঘের রাজসিক প্রস্থান খুব ভাবিয়েছে আমাকে। সবাই যখন রোলমডেল হিসেবে শৃংখলা অনুবর্তী মানুষদের বেছে নেয়,আমি তখন বেছে নিয়েছি ফুটবল আইনের চোখে উছৃংখল এই দুই সুপারম্যান কে।

ম্যারাডোনা যখন মাঝ মাঠ থেকে বল নিয়ে একে একে বাধা ঠেলে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতেন,দারুণ এক শিহরণ অনুভব করতাম।ম্যারাডোনার চারপাশ থেকে ঘিরে ধরা আপাত দীর্ঘদেহী খেলোয়াড়দের লিলিপুটিয়ান্স মনে হতো,আর ম্যারাডোনা ছিল আমার চোখে গ্যালিভার যাকে বেধে রাখা বামন মানুষদের সাধ্য কী।ম্যারাডোনা তার খেলোয়াড়ি জীবনে প্রতি সেকেন্ডে অন্তত তিনজন খেলোয়াড়ের গার্ডে থাকতেন। গোলকের আর কোন খেলোয়াড়কে এত পাহারায় রাখেনি ফুটবলারকূল।

ম্যারাডোনার এলোমেলো অথচ লক্ষ্যভেদী মৃগয়া ভালো লাগেনি ফিফাকত্তাদের।ফিফা ম্যারাডোনাকে স্টিমুলাইজার বা এনার্জি এনহ্যান্সার ওষূধ সেবনের জন্য লাল কার্ড দেয়।ফিফা ম্যারাডোনার আচরণকে ফুটবলের সংস্কৃতির জন্য ক্ষতিকর মনে করে।যে ফিফা স্পন্সরদের কাছে ফুটবলের আত্মা বেচে দেয় সেই নৈতিকতার ডান্ডা দেখিয়ে ম্যারাডোনার জয়রথটাকে আইনের কালো শক্তি দিয়ে থামিয়ে দেয়।এই ডোপিং টেস্ট করলে চে গুয়েভারা ,জন লেনন বা ভ্যানগগের বিপ্লবী-গায়ক-চিত্রশিল্পীর মুকুটগুলোও কেড়ে নিতে পারেন একবিংশের সুশীল প্রতিষ্ঠান গুলো।

ফিফা ম্যারাডোনার বিরুদ্ধে অন্যদলের খেলোয়াড়দের ক্যানিবাল ফাউল চোখে দেখলেন না,ম্যারাডোনাকে ফেয়ার প্লে গ্রাউন্ড নিশ্চিত করতে পারলেন না, অথচ বামনদের ট্রফি জেতা অনায়াস করতে সরিয়ে নিলেন আমাদের সুপারম্যান কে। ম্যারাডোনার মৃত্যু আমার চোখে ফুটবলের মৃত্যু। তাই ম্যারাডোনা মাঠ থেকে বেরিয়ে যাবার পর আমি ক্রিকেট অনুরাগী হয়ে পড়ি।

ম্যারাডোনার প্রস্থানের পর ফুটবল ব্যাপারটাকে এড়িয়ে চলেছি। কিন্তু জার্মানীতে ২০০৬এ অনুষ্ঠিত ফিফা শীর্ষ আসরটি কাভার করতে হয় ডয়চেভেলে,ভয়েস অব এমেরিকা আর সমকালের জন্য। ফলে আবার জিদান কে উপলক্ষ্য করে নিজের ভেতরে ফুটবল আগ্রহ জারিত করেছিলাম। ম্যারাডোনার ফুটবল ছিল যাদু বাস্তবতা। পাঁচটা ক্যামেরার একটাও নিশ্চিত করতে পারেনি ম্যারাডোনার সেই গোল্ডেন গোলটি ঈশর নাকি ডারউইন,নাকি ম্যারাডোনা নিজেই দিয়েছেন। জিদান সেখানে যেন ফরাসী রেনেসার এক স্মিত হাসিমুখ, মাতারাতসীকে মার দেবার আগে কখনো জিদানের ক্রোধ কেউ দেখেনি। মাতারাতসীর লিপসিং এনালাইজ করে দেখা গেছে, তিনি জিদানকে তার বোনের সম্ভ্রম নিয়ে কটাক্ষ করেছিলেন। ফিফা ইতালীয় রেগুলার মাস্তানের চেয়ে ভাবুক জিদানকেই বেছে নিল শাস্তির জন্য।আবার একজন গ্যালিভার ট্রফি পিছে ফেলে লাল কার্ড নিয়ে হেঁটে গ্রীণরুমে। বামন সেপ ব্লাটার খুশীতে বাকবাকুম,ফুটবলের লিলিপুটিয়ান ধারার পৃষ্ঠপোষকতায় তার নাম তামার অক্ষরে লেখা থাকবে।জিদানের পা মাথা ঘাড় ঘুরে ফুটবল এক লাস্যময়ী প্রেমিকার মতো জড়িয়ে থাকতো তাকে। সেই জিদান যখন ম্যারাডোনার মতো প্রস্থানের নিয়তি বরণ করলেন,ফুটবল একা হয়ে গেলো।

ফিফার আইনে ফুটবলের ঐ দুই সুপারম্যান অপরাধী।ম্যারাডোনাকে ল্যাং মেরে ফেলে দেবার দল বা জিদানের বোন তুলে গালি দেয়া ফুটবল মাফিয়া মাতারাতসী ফিফার পদক গলায় নিয়ে টিভি ক্যামেরার সামনে এসে বিজয়ের হাসি হেসেছে,অথচ ক্যামেরা খুঁজেছে ঐ দুই পরাজিত মেঘকে।

ফিফার এই আচরণ প্রতিষ্ঠানের অমোঘ নিয়তি। আমরা যেমন সিটিজেন বা নেটিজেন হিসেবে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছে নাকে খত দিয়ে বসে আছি।স্কুল,হাসপাতাল,যানবাহন,নিরাপত্তা সব কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্ধক দেয়া। প্রতিষ্ঠানকে মিশেল ফুঁকো কারাগার বলতেই ম্যারাডোনার মুখ ভেসে ওঠে চোখের সামনে। আর প্রতিদিনের যাপিত জীবনে রাষ্ট্রের যে নিষ্ঠুর কারারক্ষকের ভূমিকা দেখি তাতে বুঝতে বাকি থাকেন,রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের দণ্ডমুন্ডের কর্তারা আমাদের আম বা স্ট্রবেরী জনতাকে নানারকম কারাগারে আটকে রেখে প্যানোপটিক ওয়াচ টাউয়ার থেকে দেখে। যারা কয়লাখনির ময়লা শ্রমিক বা হীরক খনির জেল্লা শ্রমিক, তাদের সবার কোমরে এক অদৃশ্য সূতা,মিডিয়া আজকাল ভক্সপপে তুলে আনা এইসব গুয়ানতানামো পুতুল নাচের ইতিকথা দেখিয়ে পয়সা কামায়। এই কয়েদীদের মাঝে হঠাত একজন অতিকায় ম্যারাডোনা-জিদান বা গ্যালিলিও,ভয় পেয়ে যায় কারা রক্ষীরা।

কারণ কয়েদীদের মধ্যে অনুগতদের পাহাড় আড়াল করা বামন নাচ স্পন্সর করে ক্ষমতা কাঠামো। সাফল্য ব্যর্থ তার জুরি হতে খুব পছন্দ করে অক্ষম এবং বামন ক্ষমতা কাঠামো।

রমনা থানার দারোগা,ভূমি অফিসের কেরানী,ঊঠতি লেখক সবাই রাষ্ট্রের বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার পুতুল নাচে আমজনতার কোমরের দড়িগুলো টানার সোল এজেন্সী চায়। অথরিটি চায় পুলিশ কন্সটেবলের মতো। গুন্টার গ্রাসের টিনড্রামের মতো বারবার পেশী ফুলিয়ে পৌরুষ দেখাতে চায়,পরে ব্যর্থ হয়ে দেয়ালের কোণায় গিয়ে আক্ষেপ করে,এই আক্ষেপ সেপ ব্লাটাররা সবাই করেন,যখন দেখেন তিনি আর তার পারিষদেরা ছাড়া গ্যালারীর স্ট্রবেরীজনতা তাদের খলনায়ক ট্যাগিংকে নিকুচি করে ম্যারাডোনা আর জিদানকে ভালোবাসার নায়ক হিসেবে সুচিহ্নিত করছেন,সেপ ব্লাটারের ছাত্ররা টিনড্রামের মতো ব্যর্থ রিরংসার গ্লানি নিয়ে বসে থাকে।কারণ গ্যালিলিওকে আইন দেখিয়ে প্রাণ দন্ড দেয়া যায়,কিন্তু তার আত্মা আমন্ত্রণ পেতে থাকে ঘরে ঘরে, একটা ছোট্ট শিশু যখন আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে নাম জিজ্ঞেস করে, গ্যালিলিও কানের কাছে ফিসফিস করে বলেন, ম্যারাডোনা –জিদান।

http://www.sachalayatan.com/maskwaith/34952

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: