প্রসঙ্গঃ প্রিয় মুভি

আজকে আমার তিনটা পছন্দের তিনটা মুভি নিয়া কিছুক্ষণ আলোচনা করতে চাই। মুভিখোর হিসেবে আমার কোন নির্দিষ্ট পছন্দ নাই, ইরানী থেকে ফ্রেঞ্চ সবই খাই B-) । তবে আজকে যে তিনটা নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছি তার সবগুলোই ইংরেজি ছবি, হলিউডি ছবি।
এবং সতর্কতা ! : তিনটা ছবিই সাদাকালো যুগের এবং ফিকশন ধর্মী, কাজেই যারা অ্যাকশন ফিল্মের ভক্ত বা রঙীন ছবি দেখে অভ্যস্ত তারা দয়া করে পোস্ট না পড়ে চইল্যা যান, তবু আমারে মাইনাস দিয়েন না!! :P

১। ক্যাসাব্লাংকা(১৯৪২)
casablanca.jpg

আমার সবসময়কার প্রিয় ছবির তালিকায় এই ছবিটা উপরের দিকে থাকবে। কাহিনীর পটভূমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের । ১৯৪২, মরোক্কোর ক্যাসাব্ল্যাংকা শহর। ক্যাসাব্ল্যাংকা তখন নাৎসীদের দখলে। ক্যাসাব্ল্যাংকার অন্যতম জনপ্রিয় ক্যাফে “রিকস ক্যাফে”র মালিক আমেরিকান রিক ব্লেইন ওরফে রিক। তখনও আমেরিকা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। কাজেই রাজ্যের মানুষ এসে ভিড় জমাত ক্যাসাব্ল্যাংকাতে আমেরিকার ট্রানজিটের জন্য। এর বেশিরভাগ কাজকর্মই আড়ালে চলতো রিকে’র কাফেতে। রিক বড় রহস্যময় মানুষ, কেউ তার ইতিহাস ভালো করে জানে না। শোনা যায় সে নাকি ইটালি আর স্পেনের বিপ্লবে অংশ নিয়েছিলো। অত্যন্ত রিজার্ভড চরিত্রের অধিকারী। এমনকি কখনো কাস্টমারদের সাথে্ ড্রিংক করায় অংশ নেয় না। তবে তার ড্যাশিং ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠে প্রতিটা আচরণে।

ঘটনাক্রমে আমেরিকার ভিসা নিতে রিকের ক্যাফেতে হাজির হয় একজন জার্মানবিরোধী উঁচুদরের নেতা ভিক্টর লাজলো। তার সঙ্গে আসে ইলসা, রিকের প্রাক্তন প্রেমিকা। তাকে দেখে রিকের মনের বহুদিনের চেপে রাখা আবেগ উন্মোচিত হয়ে পড়ে।ভেঙে পড়ে তার স্থৈর্যের বাঁধ। জানা যায় ক্লাসিক এক প্রেম-উপাখ্যান এর কথা।

তারপর মানব মনের চিরন্তন টানাপোড়েন ।আবেগের সাথে যুক্তির লড়াই। যেখানে শেষ পর্যন্ত রিকের চারিত্রিক দৃঢ়তার প্রতিফলন ঘটে আর একই সাথে সুমহান ত্যাগের প্রতিফলন ঘটে। তাই জার্মানরা যখন পাগলা কুকুরের মতো হন্যে হয়ে ভিক্টর লাজলোকে খুঁজে বেড়াচ্ছে তখন সে ভিক্ট্রর লাজলো আর ইলসা দুজনকেই প্লেনে করে আমেরিকা পাঠিয়ে দেয়।আহা সে এক দেখার মত দৃশ্য!!

ছবির সবচে উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো হামফ্রে বোগার্টের অনন্যসাধারণ অভিনয়কুশলতা। পার্সোনালিটির সংজ্ঞা বোধ হয় নতুন করে আবিষ্কার করেছি তাঁর অভিনয় দেখে। হলিউড ইতিহাসে তার মত ব্যক্তিত্ববান অভিনেতা বোধ হয় কমই এসেছে।সন্দেহ নেই কেন তাঁকে হলিঊডের সেরা অভিনেতাদের মধ্যে উপরের দিকে স্থান দেয়া হয়।

দ্বিতীয়ত, নয়নমনোহারিণী ইনগ্রিড বার্গম্যানের ইলসা চরিত্রের অসাধারণ কমনীয় রূপায়ন, মনে আছে অনেকদিন আগে টাইম ম্যাগাজিনে একদিন তার মৃত্যুসংবাদ দেখেছিলাম। সেসময় তার ছবি দেখেই তার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম, তার বহুদিন পর মুভিটা দেখেছি। কিন্তু সেই মুগ্ধতার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয় নি। ছবির কিছু কিছু সংলাপ হলিউডের অলটাইম পপুলার লিস্টে ঢুকে গেছে।
যেমন:
“Here’s looking at you, kid(6)
“Louis, I think this is the beginning of a beautiful friendship.” (20th)
” We’ll always have Paris.” (43rd)
“Of all the gin joints in all the towns in all the world, she walks into mine.” (67th)

তবে এ সংলাপ গুলো’র গ্র্যাভিটি বুঝতে হলে মুভিটা দেখতে হবে। ক্যাসাব্ল্যাংকা আমার দেখা সবচে দুর্দান্ত কালোত্তীর্ণ রোমান্টিক চলচিত্র এবং একইসাথে আমার দেখা সেরা বেস্ট মেইল পারফরমেন্স। নায়কের প্রেমেও পড়া যায় তার সবচে উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হামফ্রে বোগার্ট অভিনীত রিক ব্লেইন।প্রতিবার দেখি আর ভাবি “আহা যদি রিক হইতে পারতাম!!” 8-|

ছবিটার রঙীন ভার্সন বের হয়েছিল। ফ্লপ খাইসে /:)। এর মহিমা সাদাকালোতেই খুলেছে ভালো!

ডাউনলোড করুন এখান থেকেঃ
Casblanca

২। It Happened One Night(1934)
it-happened.jpg

এটা অবশ্য একটা বিশুদ্ধ রোমান্টিক কমেডি।বয়সে যদিও অতি প্রাচীন তবুও কাহিনীটা চিরতরুণ। অভিনয় করেছেন সাদাকালো যুগের আরেক প্রবাদপুরুষ ক্লার্ক গ্যাবল। ছবির কাহিনী শুনলে অনেকটা বাংলা সিনেমার কথা মনে হবে! ওয়াল ষ্ট্রীট মুঘল ব্যাংকার এর মেয়ে বাপের সাথে রাগ করে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে, (ইয়ট থেকে লাফ মেরে পানিতে পড়েছে, তার পর সাঁতরে পালিয়েছে!! ও ভাই!! ) তার প্রেমিকের সাথে মিলিত হবার জন্য। পথে ক্লার্ক গ্যাবলের সাথে দেখা, যিনি আবার পেশায় সাংবাদিক। তো সাংবাদিক সাহেব সুযোগ পেয়ে ভাবলেন এই সেলিব্রিটিকে নিয়ে একটা স্টোরি করতে পারলে মন্দ হয় না( ঠিক যেন রোমান হলিডে)। তারপর পথে যেতে যেতে ঘটে মজার সব ঘটনা। সবগুলোর বিবরণ দিয়ে লাভ নেই। তবে বাসে যখন “ফ্লায়িং ট্রাপিজ” গানটা সবাই গাইতে থাকে তখন ইচ্ছে হয় আমিও ওদের সাথে যোগ দেই! যদিও গানটার পটভূমি বা কাহিনী কিছুই জানি না। এমনই সেটার স্বত:স্ফূর্ততা!! কালোত্তীর্ণ শিল্পের এই বোধ হয় ধর্ম। আরক দৃশ্যে ক্লার্ক যখন ১০০০০ ডলার এর প্রাইজমানির কথা ভুলে গিয়ে উনচল্লিশ ডলারের জন্য হম্বিতম্বি করতে থাকেন, সে এক ভারী উপভোগ্য দৃশ্য! শেষ দৃশ্যে যখন নায়িকা বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে যায়, সেটা আমার সবচে প্রিয় দৃশ্য গুলোর মধ্যে অন্যতম( এরকম আরেকটা দৃশ্য আছে The graduate এর ফিনিশিং এ)। এমনি মজার মজার সীন দিয়ে পুরো ছবিটাই ভর্তি । তা ছাড়া এই ছবির নায়িকার চার্ম অনির্বচনীয় ! আমার ছোটবোন এত মুভির ভক্ত না, কিন্তু খালি নায়িকাকে দেখার জন্য পুরোটা ছবি দেখেছে!! (এবং তাকে আমার প্রতিটা লাইন বুঝিয়ে বলতে হয়েছেX() বিশুদ্ধ ফ্যামিলি ফানের জন্য এই মুভির কোন জুড়ি নাই। দেখে ফেলুন এক সাপ্তাহিক ছুটির দিনে :

ইট হ্যাপেনড ওয়ান নাইট

To Kill A Mockingbird(1962)
Northern%20mockingbird.jpg

এই মুভিটা হার্পার লী রচিত ক্লাসিক উপন্যাস”To Kill A Mockingbird” এর চিত্ররূপ। অভিনয় করেছেন গ্রেগরী পেক। তাঁকে বেশিরভাগ মানুষই চেনেন “রোমান হলিডের” নায়ক হিসেবে। আমি মনে করি রোমান হলিডে-তে অড্রে হেপবার্নের কাছে গ্রেগরীর অভিনয় নৈপুণ্য কিছুটা হলেও চাপা পড়ে গিয়েছিলো। এই ছবিতে তার অভিনয় নৈপুণ্যের উৎকর্ষতা প্রকাশ পেয়েছে। এই ছবিটা দেখার আগে উপন্যাসটা পড়ে নিলে ভালো হয়। হার্পার লী রচিত এই বইটি আধুনিক যুগের ক্লাসিক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

বইয়ের কাহিনী খুবই সাধারণ।পটভূমি আমেরিকার ডীপ সাউদার্ন স্টেট অ্যালাবামার মে কম্ব নামের একটা শহর।জীবন সেখানে নিস্তরঙ্গই বলা চলে, কিন্তু আর পাঁচ দশটা সাউদার্ন স্টেটের মতো সেখানেও রয়েছে বর্ণবাদিতার বিষবাষ্প। কালোদের প্রতি নিগ্রহ। তবে এর যে ব্যতিক্রম নেই তা নয়। যেমন আইনজীবী অ্যাটিকাস ফিঞ্চ।বিপত্নীক, তার দুই ছেলেমেয়ে : জেম আর স্কাউট। মুভির কাহিনী শুরুর দিকে এই দুই ভাইবোনের দুরন্ত শৈশবকে প্রতিফলিত করেছে। হতে পারে তারা আমেরিকান শিশু, হতে পারে ছবির পটভূমি সুদূর আমেরিকার দক্ষিণ অঞ্চল। তারপরও এই দুই শিশুর চাঞ্চল্য আপনাকে মনে করিয়ে দেবে আপনার দুরন্ত শৈশবের কথা, না মনে পড়লে বুঝবেন ইদানীং আপনার মনটা বড় পাথুরে হয়ে গেছে। আরেকটা ইন্টারেস্টিং তথ্য হলো এই কাহিনীটা কিছুটা আত্নজীবনী ধাঁচের। স্কাউট মূলত হার্পার লী-রই বাল্যরূপ। কাজেই কাহিনীটা সত্যি বলে ধরে নিতে পারেন। মুভিতে “ডিল” নামের যে ছেলেটার চরিত্র দেখানো হয়েছে সেটা লেখিকার বন্ধু আরেক বিখ্যাত ঔপন্যাসিক ট্রুম্যান ক্যাপোটি’র বাল্যরূপ। ছবিটা দেখে এঁদের বাল্যকাল সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়।

আর ছবির বাকি অর্ধেক অংশের রাজা হলেন অ্যাটিকাস ফিঞ্চ ওরফে গ্রেগরী পেক। এই ভদ্রলোক এমনিতেই আমার প্রিয় অভিনেতা, এই মুভি দেখার পর আরো প্রিয় হয়েছেন। সৌম্যতা, স্থিতধী র এক প্রতিমূর্তি যেন । পেশায় আইনজীবী। নিজে শ্বেতাঙ্গ হলেও কালোদের প্রতি তার অপরিসীম মমতা। প্রয়োজন হলেও তাদের পক্ষ নিয়ে আইনী লড়াইও করেন। আরেকদিকে একজন বাৎসল্যপূর্ণ পিতা। মা হারা দুই ছেলেমেয়েকে যে স্নেহের সাথে আগলে রাখেন, দেখতে বড় ভালো লাগে । তার স্নেহ পেয়েও তার ছেলেমেয়েরা উচ্ছন্নে যায় নি, বরং বাবার নীতিবোধ অর্জন করেছে। গ্রেগরী পেক এর দুর্নাম আছে, যে তিনি ভিলেইন বা অ্যান্টি হিরো চরিত্রে অভিনয় করতে পারেন না। আমি মনে করি তাঁর জন্মই হয়েছিলো প্রশান্তি,সৌম্যতা-র প্রতিমূর্তি একজন অভিনেতা হিসেবে, এবং সেটা তার সবচে বড় সম্পদ।

ছবির কাহিনী সাদা চোখে দেখলে খুব অর্ডিনারী মনে হতে পারে, কিন্তু সহজ কথা যায় না বলা সহজে এটা স্বীকার করতে কারো দ্বিধাবোধ হওয়ার কথা নয় বোধ করি।

ছবিটার মূল থীম হচ্ছে Tranquility and Serenity ( উপযুক্ত বাংলা খুঁজে পাচ্ছি না বলে নিজেকে একটা উষ্ঠা মারতে ইচ্ছা করতেছেX()
যারা আমার মত দৈনন্দিন জীবনের ঘানি টানতে টানতে ত্যক্তবিরক্ত তাদের মনে একটু হলেও শান্তির পরশ লাগিয়ে দিতে পারে এই মুভিটি। আমার কাছে মনে হয়েছিল প্রশান্তির একটা ম্যাটেরিয়ালস্টিক প্রতিমূর্তি এই মুভিটি। আর গ্রেগরী পেক এই শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতা।

এই মুভিটা খুঁজে পেলাম না, বইটা ডাউনলোড করুন এখান থেকে :
To Kill A Mockingbird

মূল লেখার লিংক
http://www.somewhereinblog.net/blog/kishan23/29173821

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: