কম্পুটার ইঞ্জিন – হওয়ার বিপত্তিসমূহ এবং কিঞ্চিত কাগুবন্দনা

বাসার মানুষজনের সাথে আমার যে সুসম্পর্ক এতোদিন বজায় ছিল, সেটা কয়দিন টিকবে মাঝে মাঝে চিন্তা করি। বেশকিছুদিন আগে আম্মার সাথে যেমন ঝগড়া হল “মোবাইল কম্পানিগুলার” ব্যালেন্স দেখার জন্য কত নাম্বারে কল দিতে হয়, সে বিষয়ে অজ্ঞতার মাসুল হিসেবে। আর আমি কেমন কম্পিউটার “ইঞ্জিনিয়ার” (যদিও পাশ করা হয়নাই এখনো, আর হওয়ার পথটাও বেশ ভালোই মসৃণ দেখতেছি হেহে) সেটা নিয়ে মাঝে মাঝেই বেশ কিছু মধুবাক্য হজম করতে হয়। তখন আম্মাজান আমার তার পরিচিতমহল থেকে “কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার” দের উদাহরণ দিতে থাকেন আর আমার মাথার তেরটা বাজতে থাকে।

অবশ্য মানুষজনকে দোষদিয়ে কি হবে – কম্পিউটার ইঞ্জিনগিরিতে ভর্তি হতে হবে শুনে আমার কি অবস্থা হয়েছিল সেটাই বা কম কি! চার বছর ধরে এই সব ঘোড়ার ডিম পড়ব যেইগুলাতে আমি অলরেডি “বচ” আখ্যা পাইয়া আসতেছি ফ্রেন্ডসার্কেলে? আল্লাহর ওয়াস্তে চেনা একটাই জিনিস উইন্ডোজ “সেটাপ” দেয়া (যেটার জন্য প্রায়ই ডাক পড়ত আর “পেয়মেন্ট” হিসেবে খানাপিনা) মাইক্রস্ফট ওয়ার্ড, টাইপ করা (দুই আঙ্গুলে), প্রিন্ট, ডিভিডি টিভিডি রাইট করা আর সব সমস্যার সমাধান হিসেবে ফর্ম্যাট মারা, এইসব তো এখনি পারি! ইউনিতে গিয়া কি শিখুম! ধারণা আরো বদ্ধমূল হল সেই আমলে জানা “বাংলার বিলগেটস” কাগুর কাছ থেকে প্রুগ্রামিং শিখে “প্রুগ্রামাড়” হয়ে যাওয়া। মাধ্যমিকে কম্পিউটার শিক্ষা যদিও ছিল না, কাগুরচিত বোর্ডের বই নিজে নিজে পড়ে “ড্রাগ-এন’-ড্রপ” প্রুগ্রামাড়হয়ে গেলাম। সে বইতে ভিজ্যুয়াল স্টুডিও দিয়ে একটা উইন্ড এনে তাতে এক্টা ছবি টবি বসিয়ে দিয়ে “প্রোগ্রামিং” শেখান হয়েছিল। (পাঠকের সুবিধার্তে – ব্যাপারটা ঘরোয়া থেকে খিচুড়ি কিনে এনে বাসায় বন্ধুদের দাওয়াত দিয়ে “আজ যা রাধলুম না দাদা” কেইসের মত।)

যাইহোক, বাসার মানুষজনকে আমি মাঝে মাঝেই “পেশাগত” সার্ভিস দিয়ে থাকি, কারণ এতে তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধা পাওয়া যায়। আমার ব্যক্তিগত ফার্মে (আমড়াসফট – হোম এডিশন) যেই ইনসোর্সিং এর অর্ডার সবচেয়ে বেশি আসে তা হল প্রিন্টের প্রোজেক্ট পাওয়া। বাসার লোকজনদের প্রিন্টের মার্কেট ধরে পুরা কাগুস্টাইলে তাদের লুটেপুটে নেই। আরো আছে যেমন রেজাল্টের মৌসুমে ওয়েবসাইটে রেজাল্ট দেখে দেয়ার মৌসুমি ব্যবসা। বিনিময়ে হয়ত ঐ মাসের ইন্টারনেট বিল্টিল উনাদের হাতে ধরিয়ে দেয়া যায়।

এইসব প্রজেক্ট খারাপ না, তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা “মেজাজ” কন্ট্রল রাখা! হিসেবে গড়মিল হইলেই “ক্লায়েন্টের” কাছ থেকে যেইসব মধুমাখা উক্তি আসে সেগুলা আমি নিঃস্নদেহে শুধু একটামাত্র লোকই শোনার যোগ্য – আমাদের কাগু। এছাড়া ক্লায়েন্ট আবার “কাছের মানুষ” তো, আদর করে “ডেভু” সম্পর্কে যা ভাবেন সেটা “খোলামেলাভাবেই” জানিয়ে দিতে তারা আপত্তি করেন না!

যা-ই হোক, আজকের কাহিনী বলি। ঘটনার সূত্রপাত আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত ক্লায়েন্ট মিসেস “আম্মুর” কাছ থেকে “প্রিন্টের প্রোজেক্ট” টা পাওয়ার মধ্য দিয়ে। আম্মাকে দিচ্ছি দিচ্ছি রাতেই করে রাখব বলে ভোর ৪টা পর্যন্ত মুভি দেখে দিলাম ঘুম।

সকালে ঘুম ভাঙ্গে স্টুডেন্টের ফোনে, যাওয়া লাগবেই। এইরে, মানিব্যাগ যে রিক্ত সেটা বেশ ভাল্ভাবেই মনে আছে। উপায় একমাত্র প্রিন্টের প্রোজেক্ট নগদে ডেলিভারি দেওয়া!

আম্মু কিছুক্ষণের মধ্যেই বেড়িয়ে যাবে, তাড়াতাড়ি ডেস্কটপ অন করলাম, অইটাতে গুইন্ডজ সেভেন সেটাপ দেওয়া আছে, প্রিন্টার লাগিয়ে নিলেই ড্রাইভার পেয়ে যাবে।

হায়রে! সরকারী ওয়েবসাইট থেকে এক্টা ফরম নামায়া প্রিন্ট দিতে হবে, সাইটে গিয়ে দেখি উহা গৌরবের সাথে কাগুর ঝাণ্ডাবাহী “ভিজইয়” দিয়ে লেখা দুর্বোধ্য সব ফন্ট বহন করছে। এত গুলা লিংক থেকে এখন কোন ফর্মটা নামাব! ব্রুট ফোরসে সবগুলা ফর্ম ই নামায়ে টেস্ট করা যায়। ওয়েট এ মিনিট, সাইট যেহেতু “ভিজইয়” এ বানানো, ফর্মের পিডিএফ গুলাও “ভিজইয়” দিয়েই লিখছে শালারা! তাইলে “ভিজইয়” ই সেটাপ দিয়া দেই।

হার্ডিস্কের গার্বেজ ড্রাইভ হাতড়ে “ভিজইয়” এর এক্টা কপি পাইলাম, সেটাপ দিতে গেলেই মরার ফেইল করে! ফেইল করছে করছে শালা মইরাও শান্তি দেবে না, এক্টু পরপর “ভিজইয় ইজ নট ইন্সটল্ড প্রুপারলি, ভিজইয় ইজ নট ইন্সটল্ড প্রুপারলি” এরর মেসেজ বক্স দেখান শুরু করল। মেজাজ ১০০ ডিগ্রি অল্রেডি পার করছে, তাও বুদ্ধি খাটায়া ভাব্লাম, “ভিজইয়” টু ইউনিকোড কনভার্টর নামাই। নামানোর পর আরেক বিপদ, কনভার্টর দেখি পিডিএফ রে কনভার্ট করতে পারে না, ডক ফাইল্রে পারে। হাআআআআহ! আবার অফিস সেটাপ দাও – অইদিকে আম্মা কন্টিনিউয়াস পিং করতেছে আর আমি The server might have been busy রেসপনস পাঠাচ্ছি।

১০ মিনিট ধরে অফিস সেটাপ দিয়ে, গুগলে এক্টা “ফিরি অনলাইন পিডিএফ টু ডক কনভারটর” সারচ মেরে, এরপর যদি দেখি অবশেষে কনভারটর কাম করে না, তাইলে কেমন লাগে?

এর মাঝে আম্মাজান তার অন্নপাপী কম্পুটার ইঞ্জিনিয়ার পুত্রের যোগত্যা নিয়ে শুধু প্রশ্ন তুলেই ক্ষান্ত হন নি, অন্য “ইঞ্জিনিয়ারদের” সাথে তুলনা শেষ করে কেন এক্টা কাজ ও আমাকে দিয়ে হবে না বাপজানের কাছে ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছেন। আমি শেষ ভরসা হিসেবে এক্সপিতে ঢুকে, নেট ঘেটে একজন গর্বিত “ভিজইয়িয়ান” এর আপলোড করা (সেখানে অনেক গুণগাণ লেখা আছে দেখলাম) “ভিজইয়” নামাচ্ছি আর কেন আমি “ওমুক আপার ছেলে এত ভাল টাইপ, প্রিন্ট করটে পারে আর তুই পারিস না” এর ব্যাখ্যা হিসেবে কি বলা যায় সেটা ভাবতেছি। আব্বাকে দলে টানার জন্য ভাব্লাম কাগুরে এক্টু সাইজ করি এবেলা – এই গোস্ত-খা পোদ্দার যে কি সব আজেবাজে সফটওয়ার বানায় – এইটুক না বলতেই আব্বু লাফায়া উঠল, আরে গোস্ত-খা পোদ্দার তো আমাদের দেশী মানুষ, তোর ওমুক ভাইয়ার চাচা, পরিচয় করায়া দিবনে কোন সমস্যা হলে!

হ, আর আমার যা এক্টু “পেস্টিজ” আছে ওইটারেও ফালুদা বানানো আরকি! তয় যা বুঝলাম, দেশের সিংহভাগ মানুষ ই গোস্ত-খা পোদ্দার কাগুরে আইডল হিসেবে চেনে। বিচিত্র কম্পিউটার ইঞ্জিন দিয়ে ভরতি এই দেশ! আমি গজগজ করতে করটে প্রিন্ট কমান্ড দিতে গিয়ে খেয়াল করলাম এক্টা “ফাউন্ড নিউ হার্ডওয়ার” উইন্ড দেখা যাচ্ছে।

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: