প্রকৌশলের মহারথীরা-১: কলিন চ্যাপম্যান

কলিন চ্যাপম্যান

তখন বড় অস্থির সময়। ২য় বিশ্বযুদ্ধের পাট চুকেছে দুই বছর হল। কিন্তু এর প্রভাব যেন সিন্দাবাদের ভূতের মতই বিজয়ী এবং বিজিত দুই পক্ষের অর্থনীতির ঘাড়েই চেঁপে আছে। অটোমোবাইল শিল্পও এর ব্যতিক্রম নয়। একটু চিন্তা করলেই কিন্তু এর কারণটা বোঝা যায়। আপনি কিন্তু একটি গাড়ি দিয়েই মোটামুটি এক জীবন পাড় করে দিতে পারেন। তাহলে প্রশ্ন হল পাব্লিক বছর বছর নতুন গাড়ি কেনে কেন? এর উওর হচ্ছে গাড়ির চটকদার ডিজাইন এবং গতি। কিন্ত যে সময়ের কথা বলছি সে সময়টাতে ম্যানুফ্যাকচারেরা গতি জিনিসটাকে অত গুরুত্ব দিতেন না। আর আমজনতার পকেটের অবস্থাও ছিল খারপ। এই অবস্থায় শুধু চোখের ক্ষুধা মেটানোর জন্য কে নতুন গাড়ি কেনে?
এই যখন অবস্থা তখন বিভিন্ন অটোমোবাইল শিল্পের মালিকেরা ১৯৫০ সালে প্রবর্তন করলেন ফর্মূলা ওয়ান রেসিং। ইউরোপ, উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় সেই ১৯২০ সাল থেকেই গাড়ির রেসিং এর চল ছিল। কিন্তু সেগুলোর সবগুলোই ছিল ব্যক্তিগত উদ্যেগে। শুধু শখের বশেই রেস করতেন তাঁরা। কিন্ত ফর্মূলা ওয়ান ছিল প্রফেসনালদের জন্য। বিজয়ী অটোমোবাইল কোম্পানীর মালিকেরা কিন্তু ঠিকই একটি বার্তা গ্রাহকদের পৌছে দিতে পারতেন। সেটি হল বিশ্বের সেরা প্রকৌশলী, মেকানিক এবং যন্ত্রপাতি আমাদের আছে। আপনার কী দরকার? গতি, দৃষ্টিনন্দন ডিসাইন, মাইলেজ, সহন ক্ষমতা সবই আমাদের পক্ষে করা সম্ভব। ফর্মূলা ওয়ানের উদ্দেশ্য দারুনভাবেই সফল হয়েছিল বলা যায়।
১৯৫০-৬০ এই সময়টাতে প্রবল বিক্রমে রেসিং সার্কিট দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছিল ইটালিয়ান ফেরারী, মাসেরাটি; জার্মান মার্সিডিস এবং বিভিন্ন মার্কিন কোম্পানী। কোন ব্রিটিস কোম্পানী দাড়াতেই পারছিল না এদের সামনে। নাক উঁচু ব্রিটিসেরা ফর্মূলা ওয়ানের এই রাজসিক ময়দানে নিজেদের অনুপস্থিতি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। পারছিলেন না তরুণ প্রকৌশলী কলিন চ্যাপম্যানও। মনে মনে পরিকল্পনা করা শুরু করলেন তিনি।
কলিন চ্যাপম্যান
১৯৪৮ সালে এয়ারফোর্সের কমিসন্ড র‌্যাঙ্কে যোগ দেন তিনি। কিছুদিন পরেই অবশ্য সেই পদ থেকে ইস্তফা দেন তিনি। তাঁর এই এয়ারফোর্সের সময়কালীন অভিজ্ঞতা পরবরতীতে দারুন কাজে লেগেছিল তাঁর। C.F.D.(Computational Fluid Dyanmics) এ সম্যক জ্ঞান লাভ করেন তিনি। এই C.F.D. কিন্তু রেসিং কার ডিজাইনের এক অপরিহার্য উপাদান। ব্রিটিসেরা তখন ফর্মূলা ওয়ানে নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার জন্য মরিয়া। লন্ডন শহরের প্রায় সব তরুণেরাই নিজেদের বাড়ির পিছনে গাড়ি নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা নীরিক্ষা করা শুরু করল। বিভিন্ন এয়ার ফিল্ডের পরিত্যক্ত রানওয়েতে শখের বসে রেসিং করা শুরু করল তারা। ১৯৪৮ সালে সর্বপ্রথম নিজের ডিইন করা MK1 নিয়ে এরকমই এক স্থানীয় প্রতিযোগীতায় অংশ নেন তিনি। শুরুটা বেশ ভালই হল তাঁর। তবে আসল চমকটা তিনি দেখান নিজের ডিজাইন করা MK6 দিয়ে। এই গাড়ির সবথেকে লোভনীয় ফিচার ছিল এর এডাপ্টিবিলিটি। যে কেউ নিজের ইচ্ছামত এই গাড়িটি কাস্টোমাইজ করতে পারত। এই গাড়ি দিয়ে প্রায় সবকয়টি স্থানীয় রেসিং এ জয়লাভ করেন তিনি। পরবর্তীতে বিভিন্ন রেসিং টুর্নামেন্টে জয়ী হওয়ার জন্য পাওয়া প্রাইজমানি দিয়ে উত্তর লন্ডনের হর্নেসিতে এক রেলওয়ে হোটেলের পিছনে পরিত্যক্ত এক ঘোড়ার আস্তাবলে(!!) তিনি প্রতিষ্ঠা করেন লোটাস ইঞ্জিনিয়ারিং। যারা নাক কুচকাচ্ছেন তাদের বলি যীশু খ্রীষ্ঠের জন্মও হয়েছিল কিন্তু এক ঘোড়ার আস্তাবলেই।
তাঁর লক্ষ্য ফর্মূলা ওয়ান রেসিং এর শিরোপা। আর এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ মেকানিক এবং প্রকৌশলী। ইউরোপ, আমেরিকার সেরা সব প্রকৌশলী এবং মেকানিকদের নিয়ে গড়ে উঠেছে ফেরারী, মার্সিডিজের মত প্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্তু এত দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়ার মত অর্থ যে চ্যাপম্যানের নেই। শেষ পর্যন্ত সেইসব শখের তরুণ রেসারদেরই কাছেই ছুটে যান তিনি। চ্যাপম্যানকে নিরাশ করেনি সেইসব তরুণেরা। ১৯৫২-৫৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন মডেলের রেসিং কার ডিজাইন করে স্থানীয় এবং লোয়ার ডিভিসনের বিভিন্ন রেসিং এ অংশ নিতে থাকেন চ্যাপম্যানেরা। লোটাস ইঞ্জিনিরিং এর জয় সবক্ষেত্রেই ছিল অবধারিত। ১৯৫৪ সালে চ্যাপম্যান শুরু করেন তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজ। ফর্মূলা ওয়ান রেস ট্র্যাকের উপযোগী গাড়ি ডিসাইনে হাত দেয় চ্যাপম্যানের দল। এরই মাঝে চলতে থাকে বিভিন্ন স্থানীয় এবং লোয়ার ডিভিসনে অংশ নেওয়া। সেইসব রেসিং এর প্রাইজমানি ছিল স্পন্সরবিহীন টিম লোটাসের অক্সিজেন। ফর্মূলা ওয়ান রেসিং এর জন্য ডিসাইন করা গাড়িটির নাম দেন চ্যাপম্যান MK11। ডিজাইনার হিসাবে চ্যাপম্যানের একটি দুর্বলতা ছিল। তিনি একটি গাড়ির রিলায়েবিলিটির দিকে নজর দিতেন কম। তাঁর মূল লক্য্ড ছিল গতি। বিভিন্ন স্থানীয় রেসিং এ ট্র্যাকগুলো ছিল ছোট। সেগুলোতে ল্যাপও থাকত কম। ফলশ্রুতিতে কোন ধরণের ঝামেলায় পড়তে হয়নি চ্যাপম্যানদের।
১৯৫৯ সালে ফর্মূলা ওয়ানের ছাড়পত্র পায় টিম লোটাস। তাদের শুরুটা ছিল রীতিমত ভয়ংকর। অর্ধেকের বেশী রেস শেষই করতে পারেনি তারা। এই ব্যর্থতার কারণ অভিজ্ঞতার অভাব। ঐযে গাড়ির রিলায়েবিলিটির দিকে যে নজর দিতেন না চ্যাপম্যান। দমে গেলেন না চ্যাপম্যান। এই ব্যর্থতা আরো তাঁতিয়ে তুলল চ্যাপম্যানকে। দিনরাত তিনি ডুবে থাকলেন ডিজাইন এবং বিভিন্ন জটিল হিসাব-নিকাষে। একদিন তিনি পৌছালেন কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্তে। তাঁর এই সিদ্ধান্তগুলো পালটে দিয়েছিল রেসিং এর দুনিয়া। এফ ওয়ান কে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন এক অন্য উচ্চতায়।
একজন রেসিং কার ডিজাইনার সর্বপ্রথম কারের চেসিস(গাড়ির কংকাল) ডিসাইন করে নেন। তারপর সেই চেসিসের ঊপর তিনি দেন এরোডাইনামিক প্রলেপ। এই এরোডাইনামিক প্রলেপের মূলা কাজ হচ্ছে বাতাসের ঘর্ষণ কমানো। একটি সাধারণ গাড়ির জন্য বাতাসের ঘর্ষণ অত বড় ব্যাপার না। গতিবেগ ১৫০ কিমি না উঠার আগে বাতাসের ঘর্ষণ জিনিসটা গতিবেগকে খুব একটা প্রভাবিত করে না। কিন্তু এর উপরে ঊঠতে গেলেই আপনাকে বাতাসের প্রচন্ড বাঁধার সম্মুখীন হতে হবে। একটি গাড়ির শেপ যত এরোডাইনামিক হবে তার গতি তত বেশী হবে। চ্যাপম্যান ঠিক করলেন তিনি প্রথমে গাড়ির এরোডাইনামিক অংশগুলো বানিয়ে নিবেন, তারপর সেগুলো চেসিসের উপর বসাবেন। রেসিং এবং স্পোর্টস কার ডিসাইন করার এই পদ্ধতি কিন্তু এখনো ব্যবহার করা হয়। এই পদ্ধতি ব্যবহার করার ফলে পাওয়া কারগুলো ছিল হালকা, শক্তিশালী এবং অনেক বেশী এরোডাইনামিক।

এছাড়াও কারের রিয়ার এন্ডের সাস্পেন্সনেরো উন্নতি সাধন করেন তিনি এই সময়টাতে। নিজের মেকানিক এবং প্রকৌশলীদের তাঁর এইসব ভাবনাগুলোর কথা জানান তিনি। অমিত সম্ভাবনাময় এই আইডিয়াগুলোর উপযোগীতা বুঝতে পেরে আনন্দে নেঁচে উঠলেন সবাই। কিন্তু আড়ালে বোধহয় মুচকি হেঁসেছিলেন বিধাতা সেদিন। চ্যাপম্যানের এই আইডিয়াগুলো বাস্তবায়নের জন্য চ্যাপম্যান এবং তাঁর ক্রুরা পেয়েছিলেন মাত্র ছয় মাস। তাঁদের বানানো Lotus18 কে ঠিকমত টেস্টই করতে পারেননি তাঁরা। ১৯৬১ সালে ট্র্যাকে নামে Lotus18 । ৬২ টি ল্যাপ পর্যন্ত পরিষ্কার ব্যবধানে এগিয়েছিল লোটাস। কিন্তু দুর্ভাগ্য ৬২ নম্বর ল্যাপে ক্লাচে সমস্যা দেখা দেয়। তীরে এসে তরী ডুবলো লোটাসের। এবারও চ্যাম্পিয়ন হওয়া হল না তাদের। মুষড়ে পড়ল টীম লোটাসের সবাই। হাল ছাড়লেন না শুধু একজন। তিনি হলেন চ্যাপম্যান। এতটুকু তিনি বুঝতে পেরেছিলেন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মত একটা রেসিং কার আছে তাদের।
শোকে মুহ্যমান ক্রুদের চাঙ্গা করে তুললেন চ্যাপম্যান। নবোদ্যমে কাজ করা শুরু করল সবাই। দিনে ১৪ ঘন্টা করে সপ্তাহের সাত দিনই কাজ করার রেকর্ড আছে লোটাস কোম্পানীর ক্রুদের। এর ফল হাতেনাতে পেলেন তাঁরা ১৯৬২ এর সিসনে। এই সিসনের ১০টি রেসের মাঝে ৭টি জিতে টীম লোটাস। এরপর আর পিছনে ফিরে তাঁকাতে হয়নি চ্যাপম্যানকে। নিজের নিত্য নতুন আইডিয়া দিয়ে তাঁক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি রেসিং এর দুনিয়াকে। রেসিং এর দুনিয়ায় দীর্ঘকাল ধরে এক সমীহ জাগানো নাম ছিল টিম লোটাস।
১৯৫২ সালে এক পরিত্যাক্ত ঘোড়ার আস্তাবলে লোটাস ইংনিয়ারিং এর পত্তন করেছিলেন চ্যাপম্যান। তাঁর সম্বল ছিল মাত্র কয়েকশ পাউণ্ড, নিজের প্রতি অগাধ বিস্বাস এবং ব্রিটিসদেরকে এফওয়ানের রাজসিক মঞ্চে রাজাদের রাজায় পরিণত করার এক দুর্দমনীয় স্বপ্ন। এই সুপার জিনিয়াস নিজের স্বপ্ন পূরণ করেছেন। আজ লোটাসের মূল কারখানা হচ্ছে উইমন্ডহামের নিকট হেথালে। মাত্র কয়েকশ পাউন্ড সম্বল করে চালু হওয়া লোটাসের মোট সম্পদের পরিমাণ এখন ৫ বিলিয়ন পাউন্ড।

মূল লেখার লিংক
http://www.sachalayatan.com/guest_writer/33520

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: