কুশলজিজ্ঞাসা

(হবু বর-কনে বা ঘটকের জন্য নতুন আইডিয়া হতে পারে এটি। কিঞ্চিৎ এডিটিত)

“ফোন করে সালাম দিস কিন্তু!” বড়দির উদ্বিগ্ন গলাটা ভেসে আসে হেডফোনে।

রাশেদ বিরক্ত হয়। এইসব খুঁটিনাটি তাকে আর ক’দিন ধরে মনে করিয়ে দেবে বড়দি? বড়দের বাম হাতে কোনো কিছু এগিয়ে দিস না, স্যাণ্ডেল পরেই ঘরে ঢুকিস না, সালাম দিতে ভুলিস না … অনেক তো হলো, আর কতো?

রাশেদ গোঁ গোঁ করে বলে, “আচ্ছা দেবো।”

বড়দি তবুও ভ্যানভ্যান করে, “উঁহু, একটা খাতায় লিখে রাখ। একটা খসড়া করে রাখ কী কী বলবি। শুরুতেই লেখ সালাম। তারপর জিজ্ঞেস করবি স্বাস্থ্যের কথা। তোর হবু শ্বশুরের কিন্তু ডায়াবেটিস আছে। জিজ্ঞেস করবি ওসবের কথা। এরপর শাশুড়ি কথা বলবে, খুব কষ্টি মহিলা, তাকে আরো বেশি তাজিমের সঙ্গে সালাম দিবি। তার আবার আছে লো প্রেশারের অসুখ। সেসবের কথাও জিজ্ঞেস করবি। তারপর মিষ্টি করে মেয়ের সাথে কথা বলার পারমিশন চাইবি, ঠিকাছে?”

রাশেদ বলে, “মেয়েকেও সালাম দিতে হবে নাকি?”

বড়দি বলে, “দিস! সালাম দেয়া খারাপ কী? সভ্যভব্য মানুষ সবাইকেই সালাম দেয়। আর নিজের বউকে সালাম দেয়া কি খারাপ নাকি?”

রাশেদ হাসে গ্যালগ্যাল করে। “মেয়ের কোনো অসুখ-বিসুখ নাই তো?

বড়দি বললো, “ভ্যাট! সালাম দিবি তাজিমের সাথে, ধীরে ধীরে পুরোটা বলবি। ঠিকাছে?”

রাশেদ বললো, “আচ্ছা, আচ্ছা। এখন রাখি।”

বড়দি বলতে থাকে, “একটা কাগজে পয়েন্টগুলো টুকে নে …।”

রাশেদ স্কাইপের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফোন তুলে নেয় হাতে।

মেয়েটার ছবি দেখে খারাপ লাগেনি তার। মিষ্টি চেহারা, বড় বড় চোখ, একটা সারল্য আছে অভিব্যক্তিতে, কোনো ছদ্ম, আরোপিত ভাব নেই। রাশেদের আমলনামা দেখে তাকেও নাকি মোটামুটি পছন্দ হয়েছে পাত্রীপক্ষের, জানিয়েছে বড়দির বান্ধবী, যিনি ঘটকালি করছেন। রাশেদ কষ্টেসৃষ্টে এনার নাগালের বাইরে কাটিয়েছে গত কয়েকটা বছর, কিন্তু ইনি মনে হচ্ছে রাশেদের বিয়ে অন্য কোনোভাবে ঘটতে দেবেন না, নিজেই ঘটাবেন।

ফোন তুলে ডায়াল করে রাশেদ। ওপাশে ফোন বাজা শুরু করতেই সে টের পায়, তার বুক সামান্য ধড়ফড় করছে।

একটা খিটখিটে ভারি কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, “হ্যালো?”

রাশেদ সামান্য কেশে গলা পরিষ্কার করে পুরো সালামটা দেয়, “হ্যালো, আমিন সাহেব বলছেন?”

সামান্য বিরতি ঘটে ওপাশে, তারপর সেই খিটখিটে কণ্ঠস্বর একটু নরম হয়ে আসে যেন, “হ্যাঁ, আমিন হক বলছি। কে বলছেন?”

রাশেদ যতটা সম্ভব বিনয়ের সাথে বলে, “জ্বি, আমার নাম রাশেদ …।”

আমিন হক নরম গলাতে বলেন, “আচ্ছা আচ্ছা। তা কেমন আছো বাবা?”

রাশেদ একটু চটে যায় মনে মনে। সে ভেবেছিলো, আমিন সাহেব তাকে আপনি আপনি করে বলা শুরু করবে, সে বিনয়ের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে বলবে, না না আপনি আমাকে তুমি করেই বলুন … বুড়ো একেবারে গলে যাবে তার ভদ্দরলোকপনা দেখে। কিন্তু এ তো শুরুই করলো তুমি দিয়ে। তুইতোকারি করার আহ্বান তো আর জানানো যায় না।

রাশেদ বলে, “জ্বি ভালো। আপনি ভালো আছেন?”

আমিন হক হৃষ্টচিত্তে বলেন, “হ্যাঁ, ভালো আছি।”

রাশেদ বলে, “কিন্তু আপনার না ডায়াবেটিস?”

আমিন হক এবার একটু বাঘাটে গলায় বললেন, “তো কী হয়েছে? ডায়াবেটিস হলে ভালো থাকা যায় না?”

রাশেদ একটু থতমত খেয়ে বলে, “না, তা তো যায়ই …।”

আমিন হক বলেন, “উঁহু, উঁহু। অতটা নেগলেক্ট কোরো না ডায়াবেটিসকে। সবাই ডায়াবেটিস বাঁধিয়ে ভালো থাকতে পারে না। আমি ব্যতিক্রমীদের মধ্যে পড়ি। ডিসিপ্লিন, বুঝলে, ডিসিপ্লিন!”

রাশেদ বিমর্ষ কণ্ঠে বলে, “জ্বি।”

আমিন হক বলেন, “নাও আমার ইয়ের সাথে কথা বলো।”

এবার একটি গম্ভীর, নিরস নারীকণ্ঠ ভেসে আসে, আমিন হকের ইয়ে নিশ্চয়ই, “হ্যালো।”

রাশেদ বিনয়ে গলে পড়ে বলে, “আমি রাশেদ বলছি।”

আমিন হকের ইয়ে বলেন, “বেশ বেশ, কেমন আছো বাবা?”

রাশেদ বলে, “জ্বি ভালো। আপনি ভালো আছেন তো?”

ওপাশে আমিন হকের ক্ষীণ কণ্ঠ ভেসে আসে, “ফারহা, তোমার ফোন …।”

রাশেদের হবু শাশুড়ি বলেন, “ভালো আর থাকি কীভাবে বাবা? একটা না একটা ঝামেলা লেগেই আছে।”

রাশেদ বলে, “জ্বি, হাই প্রেশার খুব খারাপ অসুখ।”

ফোনের ওপাশে গলাটা খনখন করে ওঠে, “হাই প্রেশার তো আমার নেই বাবা। হাই প্রেশার আছে তোমার সহেলি আপার।”

রাশেদ মনে মনে জিভ কাটে। সহেলি আপা, অর্থাৎ ঘটক আপার হাই শাশুড়ির ঘাড়ে চাপিয়ে ফেলেছে। এ জন্যে কি বিয়ে ভেঙে যেতে পারে? যাওয়া কি উচিত? এই যে দুই দুইবার নিখুঁত সালাম দিলো সে, এর কি কোনো দামই নেই?

রাশেদ মিনমিন করে বলে, “হ্যাঁ, লো প্রেশার আরো খারাপ অসুখ!”

আমিন হকের ইয়ে বলেন, “আমি ফারহাকে ডেকে দিচ্ছি, তুমি কথা বলো। … ফারহা, তোমার ঘরের ফোনটা তোলো তো মা!”

একটা খসখস খড়খড়ের পর একটা রিনরিনে মিষ্টি নারীকণ্ঠ বলে, “তুলেছি মা, তুমি রাখো।”

রাশেদ মুগ্ধ হয়ে যায় গলা শুনে। না, দেখতে ভালো মেয়েদের কণ্ঠস্বর খারাপ হয়, এই উপপাদ্য খাটছে না এর ক্ষেত্রে। গুড, ভেরি গুড!

রাশেদ কিছু বলার আগেই ওপাশে আমিন হকের কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হয়ে শোনা যায়, “ফারহা মা, সালাম দিস কিন্তু!”

ফারহার কণ্ঠস্বরে সামান্য বিরক্তি শুনতে পায় রাশেদ, “আমি ফারহা।”

রাশেদ একটা নিশ্চিন্ত নিঃশ্বাস ফেলে। “রাশেদ বলছি। আপনিও কি সালাম দিতে ভুলে যান?”

ফারহা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হেসে ওঠে। রাশেদ মুগ্ধ হয়ে শোনে হাসিটা। ঘটকরা কেন ইমেইলে ছবির সাথে মেয়ের হাসির এমপিথ্রি ফাইল পাঠায় না, কে জানে?

মূল লেখার লিংক
http://www.sachalayatan.com/himu/32883

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: