হিমালয়ে আমাদের মেয়েরা

লেখাটা পড়ে খুবই ভালো লেগেছে, তাই শেয়ার করলাম। মজার ব্যাপার হলো, এদের মধ্যে দুজন আপুই আমার পরিচিত। নিশু আপু হলেন আমার স্কুল জীবনের বেস্ট ফ্রেন্ড তুষারের বড় বোন। বেশ কয়েক বছর আগে আমরা আজিমপুরে একটা পাঠচক্র চালাতাম ‘আমাদের পাঠচক্র’নামে, সেটার একজন একটিভ মেম্বার ছিলেন অপার আপু।

‘ইস্, কী সুন্দর, যদি যেতে পারতাম!’ চারুকলার জয়নুল গ্যালারিতে ইমরানের তোলা হিমালয়ের ছবি দেখে সম্পা এ কথা বলেছিলেন ২০০৩-এ। স্বপ্ন পূরণ হতে অবশ্য বেশি সময় লাগেনি। ২০০৪ সালেই তিনবার হিমালয়ে গেছেন, উঠেছেন ১৯৬০০ ফুট উঁচুতে। পরের বছর মেরা পর্বতে যান আর এভারেস্ট বেসক্যাম্প ট্রেকিংয়ে মেয়ে দলের নেতৃত্ব দেন ২০০৬-এ। আমাদের মেয়েদের মধ্যে হিমালয়ের পথে সবচেয়ে বেশিবার হেঁটেছেন সাদিয়া সুলতানা সম্পা। হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট (এইচএমআই) থেকে বেসিক ও অ্যাডভান্স মাউন্টেনিয়ারিং কোর্স সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন। প্রথমটিতে ‘এ’ গ্রেড পেলেই কেবল পরেরটিতে যাওয়ার সুযোগ মেলে এসব কোর্সে। ট্রেকিং, রক ক্লাইম্বিং, আইস ক্লাইম্বিং ও গ্লেসিয়ার অনুশীলন করানো হয়। হার্নেস, জুমার, ক্রাম্পন আর আইস এক্সের মতো পর্বতারোহণের যন্ত্রপাতির ব্যবহার শেখানো হয়।

সম্পা বড় হয়েছেন পুরান ঢাকায়। ছোটবেলায় নাচ গান শিখেছেন চঞ্চল স্বভাবের মেয়েটি। মা শিরিন কামাল তাঁর সব কাজে উৎসাহ দেন, ছোট ভাই গালিব ইবনে শাহজাদা তাঁর প্রিয় বন্ধু, বিদেশে কর্মরত অবস্থায় বাবা মারা গেছেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোলে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন। ফরাশগঞ্জের মওলা বখশ সরদার মেমোরিয়াল ট্রাস্টে ইনাম আল হকের তোলা কেওক্রাডংয়ের ছবি দেখে তাঁর মধ্যে পাহাড়ে চড়ার আগ্রহ জাগে। কিছুদিন পর মদকের ছবি দেখে আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। যুক্ত হন ‘ভ্রমণ বাংলাদেশ’ দলের সঙ্গে। প্রথম ট্রেকিং করেন ঢাকা থেকে সোনারগাঁ পর্যন্ত, তারপর সীতাকুণ্ড ও কেওক্রাডংয়ে যান। পাহাড় চড়াদের সঙ্গে সখ্য বাড়ে। বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবে যাতায়াত বাড়ে। তারপর সম্পা হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের প্রথম পর্বতারোহী মেয়ে।

সম্পার পর নিশুর কথা আসে। ভালো নাম নিশাত মজুমদার, জন্ম লক্ষ্মীপুরে, বসবাস ঢাকায়। উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে সিটি কলেজে অ্যাকাউন্টিংয়ে ভর্তি হন। ছোটবোন নাভিদার মাধ্যমে বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। ২০০৩ সালে সংগঠনটি এভারেস্ট জয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে কেওক্রাডং ট্রেকিংয়ের আয়োজন করে। তাদের সঙ্গে কেওক্রাডং চূড়ায় পেঁৗছান নিশু। তারপর মাউন্টেন ডিউ টিম এক্সট্রিম প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে দল গঠনের চেষ্টা করেন। দল গঠন করতে না পেরে ব্যবস্থাপনায় যুক্ত থাকেন। পর্বতারোহীদের খোঁজখবর রাখতে থাকেন নিয়মিত। ২০০৫ সালের ডিসেম্বরের পর্বত দিবসটি নিশুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে জীবনের প্রথম টেকনিক্যাল ক্লাইম্বিং করেন। বিএমটিসির সঙ্গে যোগাযোগ তাঁর পরিচয়ের গণ্ডি বড় করে দেয়। সম্পার নেতৃত্বে এভারেস্ট বেসক্যাম্প ট্রেকিংয়ে নিশুও ছিলেন। বেসক্যাম্প ট্রেকিং তাঁর পর্বতারোহণের আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। পরের বছরই, ২০০৭ সালের মে মাসে এইচএমআইয়ের বেসিক কোর্স সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করেন। সেই বছরের সেপ্টেম্বরে মেরা পর্বত অভিযানে অংশ নিয়ে চূড়ায় আরোহণ করেন। এই প্রথম বাংলাদেশের কোনো মেয়ে হিমালয়ের কোনো পর্বতচূড়া জয় করল।

নিশুর পরে আসে অদিতির কথা। বাবা-মায়ের নিষেধাজ্ঞা তাকে পর্বতারোহণ থেকে বিরত রাখতে পারেনি। দুই ভাইয়ের এক বোন অদিতি। বাবা ড. রেজোয়ান সিদ্দিকীর চাকরিসূত্রে বহু জেলা ঘুরেছেন। সিটি কলেজে অ্যাকাউন্টিংয়ে পড়ার সময়ে নিশুর মাধ্যমে অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনে যোগ দেন। ২০০৭ সালে এইচএমআইতে বেসিক কোর্স করেন। কোর্সের অংশ হিসেবে জয় করেছেন সিকিম হিমালয়ের ১৬৫০০ ফুট পাথুরে রেনক পর্বত। সদালাপী অদিতির ভালো নাম নাহিদ আনজুম। রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে পড়াচ্ছেন এখন।

নওগাঁর মেয়ে অপার আহমেদের জন্ম মহাদেবপুরের ধামইরহাটে। ধামইরহাট মিশন স্কুল আর বগুড়া সরকারি কলেজ শেষ করে ঢাকায় আসেন। মিরপুরের বাংলাদেশ ইউনানী ও আয়ুর্বেদী মেডিসিন ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতক সমাপ্ত করেন। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জাইকায় কাজের সুবাদে জাপান থেকে পানি ব্যবস্থাপনা ট্রিটমেন্ট বিষয়ে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করেন। কৈশোরে অপার বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়াতেন। কলেজে পড়ার সময় বিএনসিসিতে ক্যাডেট হিসেবে যোগদানের পর অ্যাডভেঞ্চারের আগ্রহ বাড়ে। টেকনাফ উপকূলে করেন জীবনের প্রথম ট্রেকিং। বান্দরবানের পাহাড়ে অপারের পা পড়ে অন্য অনেকের চেয়ে আগে। ১৯৯৯ সাল। ঢাকার লোকজন তখন সবে পাহাড়ে ট্রেকিং শুরু করেছে। অপার কেওক্রাডং বিজয়ী দ্বিতীয় বাঙালি নারী। ইয়াহিয়া খানের দলের সঙ্গে সান্দাকফু গিয়ে প্রথম হিমালয় ট্রেকিং শুরু। তারপর শিলিগুড়ি-দার্জিলিং-ঘুম-মিরিক-সান্দাকফু-রিম্বিক-ফালুট-গুরদুম রুটে অতি উচ্চতায় (হাই অল্টিচিউড) ট্রেকিং করেছেন কয়েকবার। ২০০৫ সালে জাপানে গিয়ে ওসাকা, নাগোয়া ও ফুজিয়ামায় ট্রেকিং করেছেন। সালমা খাতুনকে সঙ্গে নিয়ে ২০০৬-এ এভারেস্ট বেসক্যাম্প ঘুরে এসেছেন। এইচএমআই থেকে ২০০৮ সালের অক্টোবর-নভেম্বর সেশনে বেসিক কোর্স করেন। কর্মসূত্রে এখন জাপানে আছেন।

সম্পার নেতৃত্বে বেসক্যাম্প ট্রেকিংয়ে আরো ছিলেন আফরিন খান, বদরুন্নেসা রুমা ও জেসমিন আলী। আফরিন খান সিটি করপোরেশনে কাজ করেন। অংশ নিয়েছেন নর্থ আলপাইন ক্লাবের লাংসিসারি অভিযানে লাংটাং হিমালয়ে। রুমা সরকারি কলেজে রসায়ন পড়ান এবং দলের সবচেয়ে বয়স্ক সদস্য জেসমিন আলী গৃহিণী। মে মাসে ভ্রমণ বাংলার অ্যাডভেঞ্চার সংগঠন টিম এক্সট্রিম এই মেয়েদের নিয়ে হিমালয়ে নতুন এক্সপেডিশনের পরিকল্পনা করছে।

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: