খবর যেখানে যেমন

ধরা যাক, বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ডিসি-১০ বিমান উড্ডয়নের পরপরই একটি পাখির সাথে ধাক্কা খেল। এখন আসুন দেখি বাংলাদেশের মিডিয়ার কোথায় খবরটি কিভাবে আসবে।

মিডিয়াঃ প্রথম আলো
প্রকাশের সময়ঃ ঘটনা ঘটার অন্তত দুইদিন পরে।
খবরের বর্ণনাঃ
রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড়ে যাওয়া বাংলাদেশ বিমানের একটি ডিসি-১০ বিমানের সাথে একটি উড়ন্ত চড়ুই পাখির সংঘর্ষ হয়েছে। গত পরশু দিন বিমানটি ১২৩জন যাত্রী নিয়ে হনুলুলু’র উদ্দেশ্যে যাত্রা করার সময় এ ঘটনা ঘটে। জানা যায় দুপুর বারটায় বিমানটি যাত্রা করার কিছু সময় পরেই এ ঘটনা ঘটে। তবে এ ঘটনায় বিমানের বিশেষ কোন ক্ষতি না হওয়াতে জরুরী অবতরণের প্রয়োজন পড়েনি। এ ব্যাপারে বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আক্কাস বলেন এ ধরনের দূর্ঘটনায় যাত্রীদের মনে বিরুপ প্রভাব পড়তে পারে। বিমানবন্দর এলাকায় চড়ুই পাখি থাকার ব্যাপারে সরকার একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিতি গঠন করেছে। বিমানবন্দরে চড়ুই পাখি কিভাবে এলো তা জানার জন্য বিমানবন্দরের এয়ার কন্ট্রোলারের মোবাইলে বারবার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। (কোন একটা কারণে প্রথম আলো থেকে যাকেই মোবাইল করা হয়, তাকে কখনোই পাওয়া যায় না।)

মিডিয়াঃ কালের কন্ঠ
প্রকাশের সময়ঃ ঘটনার পরের দিন।
খবরের বর্ণনাঃ
বাংলাদেশ বিমানের রাডার যন্ত্রে গুরুতর ত্রুতির অভিযোগ করেছেন বিমানের ডিসি-১০ এর হনুলুলুগামী যাত্রীরা। জানা যায় গতকাল বিমানের হনুলুলুগামী ফ্লাইটটির সাথে একটি উড়ন্ত চড়ুই পাখির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সে সময় বিমানের রাডার যন্ত্র চালু থাকলেও তাতে কোন কিছু ধরা পড়েনি। এতে করে রাডার যন্ত্রটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিগত অমুক সরকারের আমলে কেনা যন্ত্রটি নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও তা নিয়ে কোন তদন্ত হয় নি। স্বভাবতই এটি সচেতন মহলে ব্যাপক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। বিমানবন্দরের রাডার রুমে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার উদ্ধৃতি থেকে জানা যায় সে সময় রাডার রুমে কেউ ছিল না। উক্ত ঘটনার ব্যাপারে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে জানা গিয়েছে উক্ত কমিটিতে কোন বিশেষজ্ঞ নেই। এমন গুরুতর একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে করা কমিটিতে কোন বিশেষজ্ঞ না থাকার ব্যাপারটি দুঃখজনক। উক্ত ঘটনার ব্যাপারে বিশিষ্ট পক্ষীবিদ ড. তবারক বলেন, এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকলে দেশে একসময় চড়ুই পাখির প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এ ব্যাপারে উল্লেখ্য যে ঘটনার পরে প্রায় ২৪ ঘন্টা পার হয়ে গেলেও দৈনিক প্রথম আলোতে এ ব্যাপারে কোন খবর ছাপা হয়নি। কোন খবর আসেনি পত্রিকাটির অনলাইন ওয়েবসাইটেও। দেশের বিশিষ্ট নাগরিকেরা এ পত্রিকার দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। দেশের বিশিষ্ট নাগরিক রেহমান ছোবাহান এ ব্যাপারে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

মিডিয়াঃ জনকন্ঠ
প্রকাশের সময়ঃ ঘটনা ঘটার দিন সকালে (ঘটনা ঘটার সময় দুপুর ১২টা)
খবরের বর্ণনাঃ
দেশের বিরুদ্ধে গুরুতর ষড়যন্ত্রের আভাশ পাওয়া গিয়েছে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গিয়েছে আজকেই কোন এক সময় দেশের বিরুদ্ধে এ ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছি এ ঘটনা বিমানমন্দরে ঘটতে পারে। দেশের কোন কুচক্রী মহল বিমানবন্দরে এ ঘটনা ঘটাতে পারে। বাংলাদেশ বিমানেরই কোন এক ফ্লাইটের সাথে উড়ন্ত হাতির সংঘর্ষ ঘটিয়ে দূর্ঘটনা ঘটানোর সম্ভাবনা আছে বলে ধারনা করা হচ্ছে। (অনেক কষ্ট করে এটুকু কল্পনা করলাম। আর বেশি কল্পনা করা আমার পক্ষে সম্ভব না। বাকিটুকুর জন্য নিজের কল্পনাশক্তি ব্যবহার করুন)

মিডিয়াঃ আমার দেশ
প্রকাশের সময়ঃ ঘটনা ঘটার পরের দিন।
(খবরটা আসবে লাল বড় হেডলাইন দিয়ে। হেডলাইনের নিচে যা থাকবে সেটা নিচে দেয়া হল।)
খবরের বর্ণনাঃ
গতকাল বাংলাদেশ বিমানের একটি বিমানের সাথে একটু চড়ুই পাখির ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়েছে। এ ব্যাপারে হতাহতের বিস্তারিত খবর এখনো পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনায় লালবাগ থানার বিরোধী দলের সাধারণ সম্পাদক ডুমুর আলী চৌধুরীকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। জানা যায় তিনি সে সময় বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ধুমপান কুরছিলেন। তাকে স্কয়ার হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। এ মুহূর্তে তিনি সংজ্ঞাহীন রয়েছেন।সজ্ঞানে সংজ্ঞাহীন হবার আগে তিনি জানিয়েছেন, লালবাগ থানার সরকার দলীয় সমর্থকদের সাথে বিবাদের জের ধরেই তার উপর এ হামলা হয়েছে। এ ব্যাপারে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল সরকারের জ্বালানী চুরি উপদেষ্টা চুরিদুর রহমান বলেছেন, এ ব্যাপারে পার্শ্ববর্তী দেশের হাত থাকতে পারে। তিনি এ হামলার তীব্র নিন্দা জানান। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধী দলের ডাকা সংবাদ সম্মেলনে বিরোধী দলের মহাসচিব খন্দকার পাজামা(খোলা) হোসেন এ ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবী করেছেন। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে বিরোধী দলের উপর এমন বর্বর হামলা দেশের জনগণ মেনে নেবে না। তিনি আহতদের এবং নিহত পাখিটির পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেবার জন্যে সরকারকে আহ্‌বান জানান।

মিডিয়াঃ নয়া দিগন্ত
প্রকাশের সময়ঃ ঘটনার পরের দিন।
খবরের বর্ণনাঃ
দেশের বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ অমুক জেলার তমুক থানার আজাইরা নামক গ্রামের ইমামকে বহনকারী বিমানে হামলার খবর পাওয়া গেছে। জানা যায় তিনি বিশেষ কাজে হনুলুলু যাচ্ছিলেন। তাকে বহনকারী বিমানের উড্ডয়নের কিছু সময় পরপরই এ হামলার ঘটনা ঘটে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায় পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে বিশেষ মিসাইলের মাধ্যমে তার উপর এ হামলা ঘটানো হয়। তবে এ ব্যাপারে সরকার কিছুই স্বীকার করে নি। সরকারী প্রেস রিলিজে পাখির সাথে সংঘর্ষের কাল্পনিক এবং হাস্যকর ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। জানা গিয়েছে মিসাইলটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়াতে এই বিশিষ্ট ব্যক্তির কিছু হয়নি। এ ব্যাপারে বিশ্বের দেশের ইসলামী আলেম ওলামাগণ প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছেন। বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ আবুল কামাল আজাদ বলেন, (এ ঘটনার সুদূরপ্রসারী এবং কল্পনাপ্রসূত বর্ণনা।)

মিডিয়াঃ আমাদের সময়
প্রকাশের সময়ঃ ঘটনার পরের দিন।
এ ঘটনা নিয়ে দুই লাইনের একটা চটি খবর পাওয়া যাবে। তবে সেটায় আকর্ষণীয় কিছু নেই। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সম্পাদক টিপসুল ইসলাম চৌধুরীর একটা কলাম পাওয়া যাবে। আসল আকর্ষণ সেটা।
কলামটা হবে এমনঃ
গতকাল আমাদের দেশ এক ভয়ংকর বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হতে বেঁচে গেছে। এ ধরনের ঘটনার যেন পুনর্বার না ঘটে সেদিকে আমাদের নজর দিতে হবে। এ ব্যাপারে আমি বিমান কর্তৃপক্ষকে একটি টিপস দিতে চাই। পাখির আঘাত থেকে রক্ষার জন্য বিমানগুলোর সামনে বিশেষ পর্দার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে করে পাখির সাথে বিমানের পাখার ধাক্কা লাগার সম্ভাবনা কমে যায়। আপনারা জানেন বিমানের পাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি যন্ত্র। আমাদের উচিত এর সুরক্ষার দিকে নজর দেয়া। আপাতত বিমান কর্তৃপক্ষ এই টিপসটি কাজে লাগিয়ে দেখতে পারেন। পাখির সাথে বিমানের ধাক্কা লাগার ঘটনাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি বিমান কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে আরো টিপস দেয়ার চেষ্টা করব। (গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল!)

মিডিয়াঃ সামু
এ ঘটনা বিডিনিউজে আসার সাথে সাথে কয়েকটা কপিপেস্ট পোস্ট পাওয়া যাবে এবং কিছুক্ষণ পর থেকে নিয়মিত কিছু পোস্ট আসবে যেগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়।
পক্ষেঃ (এ ধরনের পোস্টের সংখ্যা খুবই নগন্য)
বিমানের সাথে পাখির সংঘর্ষের পড়েও যে কোন দুর্ঘটনা ঘটলা না সেটা যে বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনার কারণেই সেটা নিয়ে।
বিপক্ষেঃ (প্রতি এক মিনিটে একটা করে পোস্ট)
এ ঘটনা যে কত বড় একটা ঘটনা সেটা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে আমার দেশ, দৈনিক সংগ্রাম, জীবনেও শোনেন নাই এমন নিউজ সাইটের লিংক দিয়ে বোঝানো, এ ঘটনার পিছনে ভারত কত প্রকারে দায়ী সেটা, এই সরকার একটা বাকশালী সরকার সেটা হাস্যকর সব যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করবার চেষ্টা ইত্যাদি ইত্যাদি। (উদাহরণ হিসেবে দিন তিনেক আগের ফেসবুক আর গত কিছুদিন ধরে আমার দেশ নিয়ে পোস্টগুলো দেখে নিতে পারেন। একই জিনিস নিয়ে যে কত হাজার আজাইরা পোস্ট দেয়া যায় তার উদাহরন এই দুই ঘটনা)

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: